×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 7:06 pm


মন্দের জবাব উত্তম আচরণে: শত্রুতাকেও বন্ধুত্বে বদলে দেওয়ার কোরআনিক শিক্ষা

কোরআনের অনন্য নির্দেশনা অন্যায় বা মন্দ আচরণের প্রতিক্রিয়ায় আরও উত্তম পন্থা অবলম্বন করলে শত্রুতার সম্পর্কও ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিতে পারে

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের পথে মতবিরোধ, বিরোধিতা, কষ্টদায়ক আচরণ কিংবা শত্রুতার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কেউ ভালো আচরণ করতে পারে, আবার কেউ মন্দ আচরণও করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে কোরআন এ বিষয়ে একটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ নীতি তুলে ধরেছে।

আল্লাহ বলেন,

«وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ»

“আর ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত কর এমন পন্থায়, যা উত্তম। ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে যেন হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।”
— সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৪

এই আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট করেছেন ভালো এবং মন্দ কখনো এক নয়। অর্থাৎ ভালো কাজের মূল্য ও মন্দ কাজের পরিণতি এক করে দেখার সুযোগ নেই।

এরপর কোরআন মানুষকে প্রতিক্রিয়ার একটি উচ্চতর পথ দেখিয়েছে। বলা হয়েছে, মন্দকে এমন কিছু দিয়ে প্রতিহত করতে হবে, যা আরও উত্তম।

প্রতিশোধ নয়, উত্তম পন্থার শিক্ষা

মানুষ যখন অন্যের কাছ থেকে কষ্ট বা মন্দ আচরণ পায়, তখন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে একই ধরনের আচরণ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সূরা ফুসসিলাতের এই আয়াত সেই প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে উত্তম পন্থা অবলম্বনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

আয়াতটি শুধু ভালো আচরণ করার কথা বলেই থেমে যায়নি; বরং বলেছে “যা উত্তম, তা দিয়ে প্রতিহত কর।”

অর্থাৎ মন্দ আচরণের মুখোমুখি হলে প্রতিক্রিয়াটিও যেন মন্দের পর্যায়ে নেমে না যায়। বরং এমন আচরণ বেছে নিতে হবে, যা নৈতিকভাবে আরও উত্তম।

শত্রুতার সম্পর্কও বদলে যেতে পারে

এই আয়াতের সবচেয়ে গভীর দিক হলো এর পরিণতির বর্ণনা। আল্লাহ বলেন, উত্তম পন্থায় মন্দকে প্রতিহত করার ফলে এমনও হতে পারে যে, যার সঙ্গে শত্রুতা রয়েছে, সে “অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো” হয়ে যাবে।

এখানে কোরআন মানুষের সম্পর্ক পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। একটি সম্পর্ক যেখানে বিরোধ ও শত্রুতা ছিল, সেখানেও উত্তম আচরণ পরিবর্তনের দরজা খুলে দিতে পারে।

তাই কোরআনের এই শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত আচরণের নির্দেশনা নয়; এটি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

উত্তম আচরণ সহজ নয়, তবে এর মূল্য গভীর

পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন,

«وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ»

“এ গুণ কেবল তারাই লাভ করে যারা ধৈর্য ধারণ করে; আর এটি লাভ করে কেবল মহা সৌভাগ্যের অধিকারীরাই।”
— সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৫

অর্থাৎ মন্দের জবাবে উত্তম আচরণ করা সবসময় সহজ বিষয় নয়। এর সঙ্গে ধৈর্যের সম্পর্ক রয়েছে। কোরআন তাই এই গুণকে ধৈর্যশীল মানুষের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং একে বড় সৌভাগ্যের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কোরআনের দৃষ্টিতে সম্পর্ক রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি

সূরা ফুসসিলাতের ৩৪ নম্বর আয়াত মানুষের সামনে একটি স্পষ্ট নীতি তুলে ধরে

ভালো ও মন্দ এক নয়; মন্দের জবাব উত্তম পন্থায় দেওয়া উচিত।

এই নীতি ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ মানুষের বিভিন্ন সম্পর্কের ক্ষেত্রে চিন্তার একটি ভিন্ন দিক তৈরি করতে পারে। বিরোধের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে উত্তম আচরণ ও ধৈর্যকে সামনে রাখার শিক্ষা এখানে পাওয়া যায়।

কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তম আচরণ শুধু নিজের নৈতিক অবস্থানকে উন্নত করে না; কখনো কখনো বিরোধী মানুষের মনোভাবও পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

শেষ কথা

মানুষের জীবনে মতবিরোধ ও শত্রুতা আসতেই পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া কী হবে, কোরআন সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট পথ দেখিয়েছে। মন্দকে মন্দ দিয়ে নয়, বরং আরও উত্তম পন্থায় প্রতিহত করা এটাই সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আর এই উত্তম আচরণ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য। কারণ আল্লাহর ভাষায়, এই গুণ তাদেরই অর্জিত হয় যারা ধৈর্য ধারণ করে এবং এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়।

কোরআনের এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি মন্দ আচরণের জবাব কীভাবে দেওয়া হলো, সেটিই অনেক সময় একটি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

আরও