×
×
Thursday, 29 October, 2026, 1:16 pm


মৃত্যুর আগে প্রস্তুতি নিন: কোরআনের আলোকে দুনিয়ার জীবন, কবর ও পরকালের বাস্তবতা

যে জীবনকে আমরা স্থায়ী মনে করি, কোরআন সেই জীবনকেই ক্ষণস্থায়ী বলে স্মরণ করিয়ে দেয়

দুনিয়ার ব্যস্ততা মানুষকে প্রায়ই এমন এক বাস্তবতা ভুলিয়ে দেয়, যার মুখোমুখি একদিন প্রত্যেক মানুষকেই হতে হবে। দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে যায়। মানুষ জীবিকা, সম্পদ, মর্যাদা, পরিবার, পরিচিতি ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে ছুটতে থাকে। অথচ কোরআন বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় এই পার্থিব জীবন স্থায়ী নয়; প্রত্যেক মানুষকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

আল্লাহ বলেন,

“প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫

এই আয়াত মানুষের সামনে জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত বাস্তবতাটি তুলে ধরে। মানুষ যত শক্তিশালী, ধনী বা মর্যাদাবানই হোক, মৃত্যুর হাত থেকে কেউ মুক্ত নয়।

কোরআন আরও বলে,

“তুমি যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবে, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের মধ্যে থাকো।”
— সূরা আন-নিসা, ৪:৭৮

অর্থাৎ মানুষের নিরাপত্তা, সম্পদ কিংবা পার্থিব অবস্থান কোনোটিই মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না।

দুনিয়ার জীবন পরীক্ষার জন্য

মানুষের পার্থিব জীবন শুধু ভোগ-বিলাসের জন্য নয়; এটি একটি পরীক্ষা। আল্লাহ বলেন,

“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন কে আমলের দিক থেকে উত্তম।”
— সূরা আল-মুলক, ৬৭:২

এখানে কোরআন মানুষের মনোযোগ সম্পদ বা মর্যাদার দিকে নয়, বরং আমলের দিকে ফিরিয়ে দেয়। মানুষ কী অর্জন করল, কত সম্পদ জমাল কিংবা কতটা পরিচিত হলো তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কী কাজ করে গেল।

কোরআন স্পষ্টভাবে জানায়,

“আর প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখেছি এবং কিয়ামতের দিন তার জন্য বের করব একটি কিতাব, যা সে উন্মুক্ত অবস্থায় পাবে।”
— সূরা আল-ইসরা, ১৭:১৩

অর্থাৎ মানুষের কর্ম তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। দুনিয়ার জীবন শেষ হলেও তার কাজের হিসাব শেষ হয়ে যায় না।

মৃত্যু আসার আগে ফিরে আসার সুযোগ

মানুষ যতদিন জীবিত, ততদিন তার সামনে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্ত এসে গেলে সেই সুযোগ আর আগের মতো থাকে না।

আল্লাহ বলেন,

“যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, ‘হে আমার রব! আমাকে আবার ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি ছেড়ে এসেছি।’”
— সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:৯৯-১০০

কিন্তু তখন তাকে বলা হবে,

“কখনো নয়! এটি তো তার একটি কথা মাত্র, যা সে বলছে।”
— সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:১০০

তাই তওবা ও সংশোধনের সময় হলো এখন যখন জীবন আছে, যখন মানুষ নিজের কাজ পরিবর্তন করতে পারে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে।

আল্লাহ বলেন,

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো।”
— সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৮

আর যারা তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাদের জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা উন্মুক্ত।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”
— সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩

সময় থাকতে আমল কারণ প্রত্যেক কাজের হিসাব আছে

মানুষের জীবনে কোনো কাজই অর্থহীনভাবে হারিয়ে যায় না। কোরআন ঘোষণা করে,

“অতএব, যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে তাও দেখতে পাবে।”
— সূরা আয-যিলযাল, ৯৯:৭-৮

এই আয়াত মানুষের জন্য গভীর সতর্কবার্তা। ছোট বলে কোনো ভালো কাজকে অবহেলা করার সুযোগ নেই, আবার ছোট বলে কোনো অন্যায়কেও তুচ্ছ মনে করার সুযোগ নেই।

আল্লাহ আরও বলেন,

“প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে দেখে, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে।”
— সূরা আল-হাশর, ৫৯:১৮

কোরআনের এই নির্দেশ যেন প্রত্যেক মানুষের কাছে একটি দৈনিক আত্মসমীক্ষার আহ্বান আমি আগামী জীবনের জন্য কী পাঠাচ্ছি?

সম্পদ, সন্তান ও পার্থিব অর্জন সবকিছুই একদিন পেছনে পড়ে থাকবে

দুনিয়ার জীবনে সম্পদ ও সন্তান মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কিন্তু কোরআন জানিয়ে দেয়, এগুলো মানুষের চূড়ান্ত সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।

আল্লাহ বলেন,

“তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা; আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার।”
— সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৫

আর সম্পদের ব্যাপারে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন,

“তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে।”
— সূরা আল-মুনাফিকূন, ৬৩:৯

অর্থাৎ সম্পদ অর্জন কিংবা পার্থিব দায়িত্ব পালন নিষিদ্ধ নয়; বরং বিপদ হলো যখন এসব মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

কোরআনের আহ্বান আল্লাহকে স্মরণ করুন

মানুষ যখন দুনিয়ার ব্যস্ততায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন কোরআন তাকে আবার তার প্রকৃত গন্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আল্লাহ বলেন,

“আর স্মরণ করিয়ে দাও; নিশ্চয়ই স্মরণ করিয়ে দেওয়া মুমিনদের উপকারে আসে।”
— সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৫

স্মরণ তাই শুধু একটি কথা শোনা নয়; বরং স্মরণ থেকে নিজের জীবনকে সংশোধন করা। কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, সালাত কায়েম করা, সৎকর্ম করা, দান করা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকা এসবই সেই প্রস্তুতির অংশ।

আল্লাহ বলেন,

“এবং তোমরা সালাত কায়েম করো ও যাকাত প্রদান করো; আর তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণ অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১১০

কবরের পরও আছে আরেক পর্যায়

মৃত্যু মানুষের অস্তিত্বের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয় কোরআন মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও হিসাবের কথা স্পষ্টভাবে জানায়।

আল্লাহ বলেন,

“তারপর তোমরা অবশ্যই কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত হবে।”
— সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:১৬

মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী একটি অন্তরাল সম্পর্কেও কোরআনে বলা হয়েছে,

“তাদের সামনে রয়েছে একটি অন্তরাল, পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।”
— সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:১০০

অতএব কোরআনের দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবন একটি সাময়িক পর্যায়, মৃত্যুর পর রয়েছে পরবর্তী জীবন এবং শেষ পর্যন্ত রয়েছে পুনরুত্থান ও হিসাব।

সেই দিন মানুষ নিজের কাজের সামনে দাঁড়াবে

কিয়ামতের দিন মানুষের সামনে তার কর্মের হিসাব উপস্থিত হবে। আল্লাহ বলেন,

“যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার করা ভালো কাজগুলো সামনে উপস্থিত পাবে এবং সে যে মন্দ কাজ করেছে, তাও।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:৩০

সেদিন মানুষের জন্য সত্যিকার সফলতা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কোরআন বলে,

“যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সে-ই সফল।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫

তাই সময় থাকতে ফিরে আসুন

আজ আমাদের হাতে যে সময় আছে, সেটিই আমাদের সুযোগ। আজ তওবা করা যায়, আজ সালাত কায়েম করা যায়, আজ অন্যায় ছেড়ে দেওয়া যায়, আজ দান করা যায়, আজ আল্লাহকে স্মরণ করা যায় এবং আজ নিজের জীবনকে কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়।

কিন্তু মৃত্যু এসে গেলে মানুষের আর ফিরে এসে নতুন করে আমল করার সুযোগ থাকবে না।

তাই কোরআনের আহ্বানকে শুধু শোনার বিষয় হিসেবে নয়, জীবনের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের মুখোমুখি হতে হবে।

আজকের জীবনই আগামী জীবনের জন্য প্রস্তুতির সময়।

আল্লাহ বলেন—

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে দেখে, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে।”
— সূরা আল-হাশর, ৫৯:১৮

সুতরাং দেরি হওয়ার আগেই ফিরে আসুন। তওবা করুন। সালাত কায়েম করুন। আল্লাহর স্মরণ করুন। সৎকর্ম করুন। অন্যায় পরিত্যাগ করুন। নিজের জন্য এমন আমল অগ্রে পাঠান, যা কিয়ামতের দিন আপনার সামনে উপস্থিত হবে।

কারণ দুনিয়ার জীবন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু মানুষের কর্মের হিসাব শেষ হবে না।

[atn_photocard]
আরও