×
×
Tuesday, 15 September, 2026, 2:37 pm


বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুঃ জটিলতা, ব্যয় ও অনিশ্চয়তার বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের যে দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিরুৎসাহিত করছে। খাতভেদে প্রায় ২৩টিরও বেশি সরকারি দপ্তর থেকে প্রায় ১৫০টির মতো লাইসেন্স, অনাপত্তিপত্র ও অনুমোদন নিতে হয়। এর শুরুতেই প্রয়োজন হয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স। পাশাপাশি দিতে হয় ভূমি কর ও হোল্ডিং ট্যাক্স, যা নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বাধীন কমিটি।

এরপর আসে কোম্পানি নিবন্ধন, আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধনের মতো জটিল ধাপ। এ ছাড়া পরিবেশ ছাড়পত্র, পরিবেশগত সনদ, ফায়ার লাইসেন্স, ফায়ার সেফটি প্ল্যান, নির্মাণ অনুমোদন এবং শিল্পসংক্রান্ত আইআরসি (ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) গ্রহণের মতো আরও নানা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কেউ কেউ কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন, আবার কেউ সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে লোকসান সত্ত্বেও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, বাস্তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। একটি পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে মাসের পর মাস সময় লেগে যায়। একইভাবে ট্রেড লাইসেন্স পেতেও নানা হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন বছরের পর বছর আটকে থাকার ঘটনাও ঘটে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিশেষ করে আয়কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত জটিলতায় বেশি ভোগেন। নিয়মিত কর পরিশোধ করলেও কয়েক বছর পর হঠাৎ বড় অঙ্কের বকেয়া দাবির নোটিস আসে, যা পরে যাচাই করে অনেক সময় অযৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয়। এতে ব্যবসায়ীরা মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন।

ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয়ের চাপও কম নয়। লাইসেন্স ফি, সাইনবোর্ড খরচ, নিবন্ধন ফি, স্থানীয় কর, ভূমি কর সব মিলিয়ে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অনুমোদন পেতে বিভিন্ন স্থানে অনানুষ্ঠানিক খরচের অভিযোগও।

এই জটিল প্রক্রিয়ার কারণে আন্তর্জাতিক ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। সর্বশেষ মূল্যায়নে দেশের অবস্থান ছিল অনেক নিচে, যা বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও কমছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।

যদিও সরকার ডিজিটালাইজেশন ও ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি। অনলাইন আবেদন করা গেলেও যাচাই-বাছাই ও পরিদর্শন এখনো ম্যানুয়ালি হয়, ফলে সময় ও জটিলতা কমছে না।

বর্তমানে ব্যবসা নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনলাইনে শুরু করা সম্ভব হলেও নাম ছাড়পত্র, লাইসেন্স ও অন্যান্য অনুমোদন পেতে গড়ে ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস বা তারও বেশি সময় লাগে। বিদ্যুৎ সংযোগ, জমি নিবন্ধন এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতেও দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, ফায়ার সেফটি অনুমোদন সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ অপেক্ষা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এ সময়ের মধ্যে জমির মূল্য, নির্মাণ ব্যয় ও ব্যাংক সুদের হার বেড়ে গিয়ে প্রকল্পের মোট খরচ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

শিল্প আইআরসি না থাকলে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করা যায় না, ফলে উৎপাদন শুরু করতেও বিলম্ব হয়। একইভাবে ফায়ার সেফটি সনদ ছাড়া ব্যাংক ঋণও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সরকার এক ছাতার নিচে সব সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে উদ্যোক্তাদের এখনো এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসা-বান্ধব নীতিমালা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দ্রুত সেবা প্রদান এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতি আরও শ্লথ হয়ে পড়তে পারে।

আরও