প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগঃ ২৬ রপ্তানিকারকের তদন্তের দাবি
দেশের ২৬টি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ সৃষ্টির গুরুতর অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
শনিবার ঢাকার পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা। তাদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ডোয়াসল্যান্ড অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান।
অভিযোগে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ আবু জাফর ও এম রিয়াজুল করিম দায়িত্বে থাকাকালে এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। সে সময় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন শহিদ হাসান মল্লিক, সৈয়দ নওশের আলী ও শাহেদ সেকান্দার।
রপ্তানিকারকদের দাবি, ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা তাদের অজ্ঞাতসারে ভুয়া বিক্রয় চুক্তি তৈরি করে, জাল ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (এলসি) ইস্যু করে এবং তাদের নামে অবৈধভাবে ঋণ সৃষ্টি করে। পরে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে ঋণ আদায়ের জন্য মামলা দায়ের করা হয়। একই সঙ্গে, বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট হিসাব বিবরণী তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়নি।
লিখিত বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক রপ্তানি নথিপত্রের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয় করে তার বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ চলতি হিসাবে জমা করত। এরপর সেই অর্থ ব্যবহার করে ডলার ক্রয় করে একতরফাভাবে জাল এলসির দায় পরিশোধ করা হয়, যা গ্রাহকদের অনুমতি ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
এই অনিয়ম গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নিরীক্ষা চালায়। সেখানে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ব্যাংকের দাবি করা বকেয়া অর্থ তাদের অনুমোদিত ঋণসীমার বহু গুণ বেশি যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অস্বাভাবিক।
রপ্তানিকারকরা আরও জানান, ব্যাংক তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করতে চাপ প্রয়োগ করে। এতে রাজি না হলে ঋণসুবিধা, এলসি সুবিধা ও প্যাকিং ক্রেডিট বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুনঃতফসিলে সম্মতি দিলেও পরে বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়। এরপর ২৬টির মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কিছু মর্মান্তিক ঘটনার কথাও তুলে ধরা হয়। টোটাল ফ্যাশনের প্রতিষ্ঠাতা এমডি হাসিবউদ্দিন মিয়াকে ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য বারবার চাপ দেওয়া হয়; একদিনেই তাকে ৩৭ বার ফোন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। এর চার দিনের মাথায় তিনি মারা যান। একইভাবে ওয়েস্ট অ্যাপারেলসের এমডি আসিফ হাসান মাহমুদ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের পর মানসিক চাপে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জননী ফ্যাশনের এমডি গৌতম পোদ্দারও গুরুতর অসুস্থ হয়ে বর্তমানে পক্ষাঘাতে ভুগছেন।
প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রকৃতপক্ষে কত টাকা অতিরিক্ত দাবি করেছে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, বারবার চাইলেও ব্যাংক তাদের কাছে হিসাব তুলে ধরেনি।
এতদিন পর কেন এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা হলো এ প্রশ্নের জবাবে আরিফুর রহমান বলেন, প্রথমে তারা ব্যাংকের অভ্যন্তরেই সমাধানের চেষ্টা করেন। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের দ্বারস্থ হলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি। এখন তাদের একমাত্র দাবি একটি স্বনামধন্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
অন্যদিকে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনজুর মফিজ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিক নিরীক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শাখাকে কেন্দ্র করে আলাদা নিরীক্ষাও করা হবে এবং একটি অভ্যন্তরীণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তদন্তের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যাবে।