ইসলামী ব্যাংক দখলের অন্তরালের গল্পঃ পদত্যাগের আগে শেষ সংলাপ “ইউ হ্যাভ টু স্টেপ ডাউন”
২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি একটি পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপ ধীরে ধীরে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের বসাতে শুরু করে। একই সঙ্গে আগে থেকেই কর্মরত কিছু পছন্দের কর্মকর্তাকে উচ্চপদে উন্নীত করা হয়।
এই সময় ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের মধ্যে দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। প্রথমত, ব্যাংকের অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, এস আলম নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য ব্যাংকে দেওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রশ্ন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একসময় সাইফুল আলম সরাসরি আরাস্তু খানের বাসায় গিয়ে তাকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেন। এর কিছুদিন পরই আরাস্তু খান পদত্যাগ করেন।
এই পুরো ঘটনার পেছনের বিবরণ বিভিন্ন সূত্র থেকে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সময়ের কয়েকজন পরিচালক, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়গুলো জানিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার তথ্য থেকেও এই প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হয়।
ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের ঘটনাটি প্রথমদিকে প্রকাশ্যে খুব বেশি আলোচিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট অনেকেই তখন ভয়ের কারণে মুখ খুলতে চাননি। এমনকি তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলতে অনাগ্রহী ছিলেন।
এই সময় গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনা যাতে প্রকাশ না পায়, সে জন্য সংবাদমাধ্যমের ওপরও চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এমনকি একটি জাতীয় দৈনিকের ছাপাখানায় গিয়ে কর্মকর্তারা পরদিনের প্রকাশিতব্য সংবাদ দেখতে চান এবং বাধা দিলে ছাপাখানা বন্ধ করার হুমকিও দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ব্যাংকের ভেতরে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে নতুন কিছু কর্মকর্তাকে বসানো হয়, যাদের অনেকেই নির্দিষ্ট একটি শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এস আলম গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সময়ে ব্যাপকহারে নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বাসিন্দা। অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠে।
অন্যদিকে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন আনা হয় এবং নতুন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো ও নীতিমালা কতটা অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
এছাড়া, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে নেওয়া এবং তা যথাযথভাবে পরিশোধ না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে এসব বিষয়ে তদন্ত শুরু হয় এবং বিষয়টি বিচারাধীন পর্যায়ে পৌঁছে।
এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। মুনাফা কমে যায়, খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে আসে।
সমগ্র ঘটনাপ্রবাহটি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রশাসনিক প্রভাব, করপোরেট স্বার্থ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার জটিল সম্পর্ক স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। পাশাপাশি এটি দেখিয়েছে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন কেবল সেই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে।