×
×
Saturday, 31 October, 2026, 9:23 pm


বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ: কুরআনের দৃষ্টিতে হিদায়াত না গোমরাহি?

লেখক ও গবেষকঃ বারাকাতুল্লাহ

পবিত্র কুরআনে অনেক জায়গায় পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণের কুফল এবং তাদের অন্ধ অনুসরণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিচে এ সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত তুলে ধরা হলো:

১. অন্ধ অনুসরণের অসারতা (সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ১৭০)
“আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন (কুরআন) তা অনুসরণ করো, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের যা করতে দেখেছি, তারই অনুসরণ করব। যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই বুঝত না এবং তারা সঠিক ও সত্য পথে ছিল না, তবুও কি তারা তাদের অনুসরণ করবে?

২. সঠিক পথে থাকা ও সত্যের অনুসন্ধান (সূরা আল-মা-ইদাহ, আয়াত ১০৪)
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রসূলের দিকে এসো’, তখন তারা বলে, ‘আমাদের জন্য তা-ই যথেষ্ট, যাতে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের পেয়েছি।’ যদি তাদের পিতৃপুরুষরা কিছুই না জানে এবং তারা সঠিক পথপ্রাপ্ত না হয়, তবুও কি (তারা তাদের অনুসরণ করবে)?

৩. অহংকার ও কুসংস্কারের পরিণাম (সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত ২৩-২৪)
“অনুরূপভাবে তোমার পূর্বে কোনো জনপদে আমি যখনই কোনো সতর্ককারী পাঠিয়েছি, তখনই তাদের বিত্তশালীরা বলেছে, ‘আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের এক মতাদর্শের ওপর পেয়েছি এবং আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।’
তখন সে রসূল বলেছিল,আমি যদি তোমাদের কাছে এমন বিষয় নিয়ে আসি, যা তোমাদের পিতৃপুরুষদের মতাদর্শের চেয়েও বেশি সঠিক ও নির্ভুল হয়,তবুও কি তোমরা তাই করবে?’ তারা বলত, ‘তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ, তা আমরা প্রত্যাখ্যান করলাম’।

৪. অন্ধ অনুকরণকারীদের পরিণাম (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬৭)
“তারা বলবে, ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম, অতঃপর তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল।

৫. চিন্তাশক্তির প্রয়োগ ও দায়বদ্ধতা (সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩৬)
“যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে।

# বি:দ্র: এই আয়াতটি অন্ধ অনুসরণ ও অনুকরণ থেকে নিষেধ করে এবং প্রতিটি বিষয় যাচাই করার নির্দেশ দেয়।)

৬. পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুসরণকারী ও শয়তানের প্ররোচনা (সূরা লুকমান, আয়াত ২১)
“আর যখন তাদের বলা হয়, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন (কুরআন) তা অনুসরণ করো,’ তখন তারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যে বিষয়ের ওপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব।’ যদিও শয়তান তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তির দিকে ডাকে!
৭. অন্ধ অনুসরণের কারণে হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়া (সূরা আল-আরাফ, আয়াত ২৮)
“আর তারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে, তখন বলে, ‘আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের এ কাজই করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন। বল, ‘আল্লাহ কখনো অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলছ যা তোমরা জানো না?

৮. আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে প্রথাকে গুরুত্ব দেওয়া (সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ১৭৪)
“যারা গোপন করে আল্লাহ যা কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন এবং তা সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করে, তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া অন্য কিছু ঢুকায় না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

৯. দলিলে বিশ্বাস ও অন্ধত্বের প্রতিবাদ (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১৫৪-১৫৭)
“তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা কেমন ফয়সালা করছ? তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না? নাকি তোমাদের কাছে কোনো সুস্পষ্ট দলিল আছে? তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের কিতাব ( গ্রন্থ) নিয়ে এসো।

# আল্লাহ এখানে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছেন যে, শুধু পূর্বপুরুষের দোহাই দিলে হবে না, বরং সত্য প্রমাণের জন্য কিতাব বা দলিলের প্রয়োজন।

১০. পূর্বপুরুষদের ভুল ধারণা ও গোঁড়ামি (সূরা আল-আরাফ, আয়াত ৭০)
“তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের কাছে এজন্য এসেছ যে, আমরা যেন এক আল্লাহর দাসত্ব করি এবং আমাদের পিতৃপুরুষরা যাদের পূজা করত তাদেরকে বর্জন করি? তবে তুমি আমাদের যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো, যদি তুমি সত্যবাদী হও’।

১১. মূর্তিপূজার সমর্থনে অন্ধ অনুসরণ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৫২-৫৪)
“যখন সে (ইব্রাহিম) তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বলল, ‘এই মূর্তিগুলো কী , যাদের তোমরা পূজারি হয়ে বসে আছো?’ তারা বলল, ‘আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের এদের পূজা করতে দেখেছি।’ সে বলল, ‘নিশ্চয় তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষরা প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে লিপ্ত আছো’।

১২. সংখ্যাধিক্য বা ঐতিহ্যের দোহাই (সূরা আল-আনআম, আয়াত ১১৬)
“আর যদি তুমি যমীনের অধিকাংশ লোকের অনুসরণ কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। তারা তো কেবল ধারণারই অনুসরণ করে এবং তারা কেবল অনুমানই করে থাকে।

# এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। বড় কোনো গোষ্ঠী বা পূর্বপুরুষরা কোনো কাজ করলেই তা সত্য হয়ে যায় না, যদি না তা আল্লাহর বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

১৩.কিয়ামতের দিনের আক্ষেপ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬৬-৬৭)
“সেদিন তাদের মুখমণ্ডল আগুনে ওলটপালট করা হবে। তারা বলবে, ‘হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রসূলের আনুগত্য করতাম!
তারা একথাও বলবে,হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তো আমাদের নেতাদের ও বড় বড় ধর্মগুরুদের অনুসরণ করেছি, তখন তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।

১৪.ইব্রাহিম ও তাঁর জাতির বিতর্ক (সূরা আশ-শুআরা, আয়াত ৭২-৭৪)
যখন ইব্রাহিম তাঁর সম্প্রদায়কে মূর্তিপূজার অসারতা নিয়ে প্রশ্ন করলেন, তখন তাদের উত্তর ছিল কেবল অন্ধ অনুসরণ:
“সে (ইব্রাহিম) বলল, ‘তোমরা যখন আহ্বান করো তখন তারা কি শোনে? অথবা তারা কি তোমাদের উপকার বা অপকার করতে পারে?’ তারা বলল, ‘না, তবে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের এরূপ করতে দেখেছি।

১৫. সত্যের চেয়ে প্রথাকে বড় করে দেখা (সূরা হুদ, আয়াত ৬২)
সালেহ এর জাতি যখন তাঁকে সত্যের দাওয়াত দিল, তখন তারা অবাক হয়ে বলেছিল:
“তারা বলল, ‘হে সালেহ! ইতিপূর্বে তোমার কাছে আমাদের অনেক আশা ছিল। আমাদের পিতৃপুরুষরা যার দাসত্ব করত, তুমি কি আমাদের তার দাসত্ব করতে নিষেধ করছ? তুমি যার প্রতি আমাদের দাওয়াত দিচ্ছ, সে বিষয়ে আমরা সন্দেহে লিপ্ত।

১৬. অন্ধ আনুগত্যের মনস্তাত্ত্বিক বাধা (সূরা সাবা, আয়াত ৪৩)
“যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, ‘এ তো কেবল এমন এক ব্যক্তি, যে তোমাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষরা যার দাসত্ব করত তা থেকে বাধা দিতে চায়।

১৭. কিয়ামতের দিন অনুসারীদের ও নেতাদের অবস্থা (সূরা আল-বাক্বরাহ, আয়াত ১৬৬-১৬৭)
যারা অন্ধভাবে কাউকে অনুসরণ করে, কিয়ামতের দিন তাদের করুণ দশা এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
“যখন অনুসরণীয় ব্যক্তিরা (নেতা ও পূর্বপুরুষ) অনুসারীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং তারা শাস্তি দেখতে পাবে এবং তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আর অনুসারীরা বলবে, ‘হায়! যদি আমাদের একবার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ হতো, তবে আমরাও তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতাম যেমন তারা আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

# আয়াতগুলো থেকে যে বিষয়গুলো বুঝা যায়:

১.আলেম বা পূর্বপুরুষরা যদি সত্য গোপন করে নিজস্ব প্রথা প্রচার করে, তবে তা গ্রহণ করা অন্ধ অনুসরণের শামিল।
২.বিবেকের স্বাধীনতা: মানুষ যা কিছু গ্রহণ করবে, তা যেন জ্ঞান ও প্রমাণের ভিত্তিতে হয়—অন্ধ অনুসরণের ভিত্তিতে নয়।

৩.দায়িত্ববোধ: কারো ভুল বা পথভ্রষ্ট হওয়ার দায়ভার অন্য কারো উপর চাপিয়ে কেউ কিয়ামতের দিন মুক্তি পাবে না।

৪.সত্যের মানদণ্ড: সত্য কোনো ব্যক্তি বা বংশপরম্পরায় চলে আসা প্রথার ওপর নির্ভর করে না; সত্য নির্ভর করে আল্লাহর কালাম (কুরআন) এর উপর।

৫.কুরআন স্পষ্ট করে যে—পূর্বপুরুষ যদি সত্যের ওপর থাকেন: তবে তাদের অনুসরণ করা প্রশংসনীয়। যেমন ইউসুফ তাঁর পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম -এর অনুসরণ করেছিল।
পূর্বপুরুষ যদি ভুলের ওপর থাকেন: তবে শুধু ‘রক্তের সম্পর্ক’ বা ‘ঐতিহ্যের’ খাতিরে ভুল পথ আঁকড়ে থাকা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।

৬.কেন এই আয়াতগুলো বারবার এসেছে?
কুরআন মূলত তিনটি কারণে এই অন্ধ অনুসরণের বিরোধিতা করে:

১.বিবেককে অবদমিত করা: মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি খরচ না করে কেবল “বাপ-দাদা আলেম উলামা করেছে” বলে কোনো কাজ করে, তখন সে পশুর স্তরে নেমে যায়।

২.সত্যকে আড়াল করা: অনেক সময় মানুষ জানে যে কাজটা ভুল, কিন্তু সামাজিক মর্যাদা বা পারিবারিক ঐতিহ্যের ভয়ে তা ছাড়তে পারে না।

৩.পরিবর্তনের পথে বাধা: সমাজ যখন কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকে, তখন সংস্কারের জন্য অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করা আবশ্যক।

[atn_photocard]
আরও