×
×
Saturday, 31 October, 2026, 8:15 pm


মুনাফিকের পরিচয় ও সমাজে তাদের কৌশলঃ

মানুষের সমাজ চিরাচরিতভাবে সৎ ও অসৎ উভয় প্রকৃতির মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। কিন্তু সৎ ও অসৎ এর এই দ্বৈতসত্ত্বা যখন জটিল রূপ ধারণ করে, তখন সমাজে এমন এক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে যারা নিজেদেরকে সৎ বলে প্রকাশ করে কিন্তু অন্তরে ধারণ করে অসততার বিষবাষ্প। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
“আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা বলে: ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং পরকালের প্রতি’, কিন্তু আসলে তারা মুমিন নয়” ।

এই আয়াত শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ নয়, বরং যুগে যুগে সমাজে বিদ্যমান এক বিপজ্জনক চরিত্রের মর্মন্তুদ বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে দিয়েছে। এরা হলো মুনাফিক বা কপট বিশ্বাসী, যারা মুখে ও লেবাসে ঈমানদার সেজে সমাজকে ধোঁকা দেয়, কিন্তু অন্তরে লালন করে অবিশ্বাস ও প্রতারণার বিষ।

কপটতার উৎপত্তি ও সমাজে এর প্রভাব

পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুনাফিকরা নিজেদের স্বার্থে প্রকাশ্য শত্রুতা না করে, অন্তরের কুফরি লুকিয়ে মুসলমান পরিচয়ের পথ বেছে নেয় । এই শ্রেণীই মুনাফিক নামে পরিচিত।

আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেন, “তারা আল্লাহর সাথে এবং মুমিনদের সাথে প্রতারণা করে, কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদের ছাড়া আর কাউকে প্রতারিত করে না, অথচ তারা তা উপলব্ধি করে না” (সূরা বাকারা: ৯) ।

অর্থাৎ এই প্রতারণার শিকার শেষ পর্যন্ত তারাই হয়, কারণ তারা সত্য ও মিথ্যার দ্বারপ্রান্তে আজীবন দ্বিধায় ভোগে।

মুনাফিকদের চিহ্ন ও সমাজে তাদের ভূমিকাঃ

কুরআন মুনাফিকদের কিছু স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে যা তাদের চিনতে সহায়তা করে

১. মুখের কথা ও অন্তরের বিপরীত: যখন তারা মুমিনদের সংস্পর্শে আসে, তখন বলে “আমরা ঈমান এনেছি”। কিন্তু যখন তাদের দুষ্ট সহচরদের সাথে নির্জনে মিলিত হয়, তখন বলে “নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সাথেই আছি, আমরা তো কেবল উপহাস করছিলাম” (সূরা বাকারা: ১৪) ।
এই দ্বিচারিতা তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

২. বাহ্যিক সৌন্দর্য ও বাক্যব্যবহারের কৌশল: আল্লাহ বলেন, “আপনি যখন তাদের দেখবেন, তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হবে এবং যদি তারা কথা বলে, আপনি তাদের কথা শুনবেন। কিন্তু তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠের মত” (সূরা মুনাফিকুন: ৪) ।
অর্থাৎ তাদের বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেও অন্তর শূন্য, কোনো দৃঢ় বিশ্বাস বা সিদ্ধান্ত নেই।

৩. অশ্লীলতার প্রচার ও সৎকাজে বাধা: কুরআনে আরও বলা হয়েছে, “মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী তারা পরস্পর একই প্রকৃতির। তারা অসৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং সৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং তারা নিজেদের হাত সংকুচিত রাখে (দান-খয়রাত করে না)” (সূরা তাওবা: ৬৭) ।

৪. তারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, কিন্তু নিজেদেরকে সংস্কারক বলে দাবি করে (সূরা বাকারা: ১১) ।

কেন মুনাফিকরা বিপজ্জনক?

প্রকৃত শত্রু চেনা যায়, কিন্তু মুনাফিকদের চেনা কঠিন কারণ তারা মুমিনদের পোশাক পরে থাকে । তারা সমাজে ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে, যা কুরআনের ভাষায় “হত্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর” (সূরা বাকারা: ১৯১) ।

আল্লাহ তাআলা তাদের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলেন: “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে” (সূরা নিসা: ১৪৫) ।

সমাজে অনেকেই মুখে ও লেবাসে নিজেদের মুমিন বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু তাদের কর্ম, অঙ্গীকার ভঙ্গ এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে তারা প্রকৃত সততার পরিচয় দেয় না। কুরআনের এই আয়াতগুলো আমাদেরকে সতর্ক করে দেয় যে, কেবল বাহ্যিক লেবাস বা মিষ্টভাষী বাক্য দিয়ে কাউকে বিচার না করে, তাদের কর্ম ও বিশ্বস্ততা যাচাই করা জরুরি। আসুন, আমরা নিজেরা মুনাফিকের চরিত্র থেকে বেঁচে থাকি এবং সমাজে বিদ্যমান এই কপট চরিত্র সম্পর্কে সচেতন থাকি।

আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে থাকার তাওফিক দান করুন।

[atn_photocard]
আরও