শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ নয়, পবিত্রতার পথে চলার আহ্বান আল্লাহর
সূরা আন-নূরের ২১ নম্বর আয়াতে মুমিনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও অন্যায়ের প্ররোচনা থেকে দূরে থেকে আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক সমাজ গঠনের শিক্ষা দিয়েছে পবিত্র কোরআন।
মানুষের জীবনে ভালো ও মন্দের মধ্যে প্রতিনিয়ত একটি দ্বন্দ্ব কাজ করে। একদিকে রয়েছে সত্য, ন্যায়, সংযম ও পবিত্রতার পথ। অন্যদিকে রয়েছে প্রবৃত্তির তাড়না, অন্যায়, অশ্লীলতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা। মানুষের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই শয়তান তাকে ধীরে ধীরে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে। পবিত্র কোরআন এই বাস্তবতা সম্পর্কে মুমিনদের সতর্ক করেছে এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেদের রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনের ২৪ নম্বর সূরা আন-নূরের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
*يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ۚ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَىٰ مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ*
বাংলা অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে ব্যক্তি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, শয়তান তো তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশই দেবে। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউ কখনো পবিত্র হতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা শুধু একটি নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেননি, বরং মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ, নৈতিক দায়িত্ব এবং আত্মশুদ্ধির একটি মৌলিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
শয়তানের পদাঙ্ক বলতে কী বোঝায়?
আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না’। এখানে আরবি ‘খুতুওয়াতিশ শাইতান’ (خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ) শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ শয়তানের পদক্ষেপ, অনুসরণীয় পথ বা তার দেখানো ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়া।
শয়তান সাধারণত মানুষকে একবারেই বড় কোনো অন্যায়ের দিকে নিয়ে যায় না। বরং ছোট ছোট প্ররোচনা, ভুল সিদ্ধান্ত, অসতর্কতা এবং নৈতিক বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে মানুষকে ধীরে ধীরে অন্যায়ের দিকে ঠেলে দেয়। প্রথমে কোনো কাজকে সামান্য ভুল বলে মনে হতে পারে। পরে সেই ভুল অভ্যাসে পরিণত হয়। একসময় মানুষ এমন অবস্থায় পৌঁছায়, যখন অন্যায়কে অন্যায় বলেও মনে হয় না।
এই কারণেই কোরআনে শুধু শয়তানের নির্দেশ অমান্য করার কথা বলা হয়নি, বরং তার পদাঙ্ক অনুসরণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ যে পথ শেষ পর্যন্ত অন্যায় ও পাপের দিকে নিয়ে যায়, সেই পথের প্রাথমিক ধাপগুলো থেকেও সতর্ক থাকতে হবে।
অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের দিকে শয়তানের আহ্বান
আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারীকে সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়। এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আরবি শব্দ এসেছে। একটি হলো ‘আল-ফাহশা’ (الْفَحْشَاءُ), অন্যটি ‘আল-মুনকার’ (الْمُنكَرِ)।
‘আল-ফাহশা’ বলতে এমন অশ্লীল ও নিন্দনীয় কাজ বোঝায়, যা নৈতিকতা ও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে। আর ‘আল-মুনকার’ বলতে এমন অন্যায় ও মন্দ কাজ বোঝায়, যা বিবেক, ন্যায়বোধ এবং আল্লাহর নির্দেশনার পরিপন্থী।
এই দুটি শব্দের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের বিস্তৃত নৈতিক সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, অন্যের সম্মানহানি করা, অশালীন আচরণ, অবৈধ সম্পর্ক, জুলুম, অন্যের অধিকার নষ্ট করা এবং অনৈতিক কাজে উৎসাহ দেওয়া এসবই মানুষের নৈতিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কোনো অন্যায় শুধু নিজে করা নয়, অন্যকে সেই অন্যায়ের দিকে উৎসাহিত করাও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হতে পারে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজে অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং অন্যায়ের পরিবেশ তৈরিতেও সহযোগিতা না করা।
ব্যক্তিগত পবিত্রতা শুধু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা নয়
আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ তাআলা মানুষের পবিত্রতা বা আত্মশুদ্ধির বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘোষণা দিয়েছেন। বলা হয়েছে, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে মানুষের কেউই কখনো প্রকৃত অর্থে পবিত্র হতে পারত না।
এখানে পবিত্রতার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে ‘যাক্কা’ (زَكَّى) শব্দের একটি রূপ। এর সঙ্গে আত্মশুদ্ধি, পরিশুদ্ধতা, উন্নতি ও পবিত্রতার ধারণা যুক্ত রয়েছে।
মানুষের পবিত্রতা বলতে শুধু শরীর, পোশাক কিংবা বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতাকে বোঝায় না। এর সঙ্গে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, চিন্তার শুদ্ধতা, আচরণের সংযম, নৈতিক দৃঢ়তা এবং অন্যের প্রতি দায়িত্বশীলতার বিষয়ও জড়িত।
একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে ধার্মিকতার পরিচয় দিতে পারেন, কিন্তু তাঁর আচরণে যদি অহংকার, হিংসা, প্রতারণা, অন্যের প্রতি অবিচার এবং অসততা থাকে, তাহলে তাঁর আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন থেকেই যায়।
প্রকৃত পবিত্রতা এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষের চিন্তা, কথা ও কাজের মধ্যে নৈতিক সামঞ্জস্য তৈরি হয়। সে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করে এবং ভুল হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করে।
আত্মশুদ্ধির মালিক আল্লাহ, মানুষের দায়িত্ব চেষ্টা করা
আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন। এই বক্তব্য মানুষের আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগ্রহ ও ক্ষমতার অপরিহার্যতাকে তুলে ধরে।
মানুষ নিজের চেষ্টা, ইচ্ছাশক্তি ও সচেতনতার মাধ্যমে ভালো কাজের পথে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার অন্তরকে প্রকৃত অর্থে পরিশুদ্ধ করা এবং সঠিক পথে অবিচল থাকার সামর্থ্য দান করেন আল্লাহ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষ যেন নিজের নৈতিক অবস্থান নিয়ে অহংকার না করে। কেউ যদি আজ অন্যায় থেকে দূরে থাকতে পারেন, তাহলে সেটিকে শুধু নিজের কৃতিত্ব মনে করা উচিত নয়। বরং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
একইভাবে কেউ ভুল বা পাপের মধ্যে জড়িয়ে পড়লে তার জন্য হতাশ হয়ে পড়ারও প্রয়োজন নেই। আন্তরিকভাবে ভুল স্বীকার করা, অনুতপ্ত হওয়া, সংশোধনের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা আত্মশুদ্ধির পথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্যক্তিগত নৈতিকতা থেকে সামাজিক নিরাপত্তা
সূরা আন-নূরের এই আয়াতের শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য রয়েছে।
সমাজে যখন অশ্লীলতা, মিথ্যাচার, অপবাদ, প্রতারণা এবং অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন মানুষের পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধ ও অবিশ্বাস বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে মানুষ যখন নিজের আচরণে সংযমী হয়, অন্যের সম্মান রক্ষা করে, সত্য কথা বলে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন থাকে, তখন সমাজে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান সময়ে এই আয়াতের শিক্ষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। যাচাই না করে কোনো সংবাদ প্রচার করা, কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপপ্রচার চালানো, অশালীন কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা অন্যকে অপমান করে আনন্দ পাওয়া সামাজিক নৈতিকতার পরিপন্থী।
একজন সচেতন মুমিনের উচিত কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা এবং এমন কোনো কাজে অংশ না নেওয়া, যা অন্যের সম্মান, নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক মর্যাদার ক্ষতি করে।
সূরা আন-নূরের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আয়াতটির গুরুত্ব
সূরা আন-নূর কোরআনের ২৪ নম্বর সূরা। এই সূরায় পারিবারিক শৃঙ্খলা, সামাজিক শালীনতা, অপবাদ থেকে সতর্কতা, দৃষ্টি সংযত রাখা, পবিত্রতা এবং সামাজিক জীবনের বিভিন্ন নৈতিক বিধান আলোচিত হয়েছে।
বিশেষ করে সূরার ১১ থেকে ২০ নম্বর আয়াতে অপবাদ ও মিথ্যা প্রচারের ভয়াবহতা এবং সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে। এর পরপরই ২১ নম্বর আয়াতে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করার নির্দেশ এসেছে।
আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, মানুষের নৈতিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করতে হলে শুধু প্রকাশ্য অন্যায় থেকে বিরত থাকলেই হবে না, বরং অন্যায়ের দিকে নিয়ে যায় এমন চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক প্রবণতা সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হবে।
আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং আত্মসমালোচনার প্রয়োজন
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। আরবি শব্দ ‘সামীউন’ (سَمِيعٌ) অর্থ সর্বশ্রোতা এবং ‘আলীম’ (عَلِيمٌ) অর্থ সর্বজ্ঞ।
মানুষ প্রকাশ্যে যা বলে, আল্লাহ তা শোনেন। আবার অন্তরে যে চিন্তা, উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা লুকিয়ে রাখে, তাও তাঁর অজানা নয়।
এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে নিজের কাজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল করে তোলে। কারণ মানুষ অন্যের কাছ থেকে নিজের ভুল লুকাতে পারলেও আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই গোপন করতে পারে না।
তাই আত্মশুদ্ধির জন্য নিয়মিত আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। নিজের কথা, কাজ, উদ্দেশ্য ও আচরণ পর্যালোচনা করা জরুরি। কোথাও অন্যায় হয়ে থাকলে তা সংশোধন করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
পবিত্রতার পথে ফিরে আসাই প্রকৃত সফলতা
সূরা আন-নূরের ২১ নম্বর আয়াত মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা। এখানে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করার নির্দেশের পাশাপাশি অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার অপরিহার্যতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, অন্যায় থেকে বেঁচে থাকা যেমন জরুরি, তেমনি অন্যায়ের দিকে নিয়ে যায় এমন প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো থেকেও দূরে থাকা প্রয়োজন। নিজের চরিত্র, চিন্তা, কথা ও কাজকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে।
মানুষের প্রকৃত সফলতা শুধু বাহ্যিক অর্জন কিংবা সামাজিক মর্যাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সফলতা হলো নৈতিকভাবে সৎ থাকা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এগিয়ে চলা।
সর্বোপরি, পবিত্রতা অর্জন মানুষের একার শক্তির বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন আন্তরিক প্রচেষ্টা, সৎকর্ম, আত্মসমালোচনা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত শয়তানের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকা এবং পবিত্রতার পথে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা।