×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 9:26 am


আল্লাহর সৃষ্টিঃ আকাশ, পৃথিবী ও পাহাড়ে ছড়িয়ে আছে প্রজ্ঞার নিদর্শন

কোরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি উদ্দেশ্যপূর্ণ আকাশ ও পৃথিবীর সুষম বিন্যাস, পাহাড়ের দৃঢ়তা, নদী-ফল-ফুল এবং মানুষের বসবাসের উপযোগী পৃথিবী আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন

আকাশের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়, পৃথিবীর দিকে তাকালে চিন্তায় ডুবে যেতে হয়। সুউচ্চ পাহাড়, প্রবাহমান নদী, সবুজ বৃক্ষ, নানা রঙের ফুল, বিচিত্র ফলমূল প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন মানুষকে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়:

এই বিশাল সৃষ্টি কি উদ্দেশ্যহীন?

কোরআন এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দিয়েছে। আল্লাহ বলেন—

رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

“হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র ও মহান। অতএব আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯১

এই আয়াতের মাধ্যমে কোরআন মানুষকে সৃষ্টিজগত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি, রাত ও দিনের পরিবর্তন সবকিছুর মধ্যেই জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।

আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এক মহৎ নিদর্শন

কোরআন বলছে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি কোনো অর্থহীন ঘটনা নয়। বরং এগুলোর মধ্যে মানুষের জন্য চিন্তা, উপলব্ধি ও শিক্ষা রয়েছে।

আল্লাহ বলেন,

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ

“নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯০

অর্থাৎ প্রকৃতিকে শুধু চোখে দেখা যথেষ্ট নয়; কোরআন মানুষকে এর পেছনের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে বলে।

পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে

পৃথিবীর বিস্তৃত ভূমি, তার মধ্যে চলাচলের পথ, পানি, উদ্ভিদ ও খাদ্যের ব্যবস্থা সবকিছু মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আল্লাহ বলেন,

وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنبَتْنَا فِيهَا مِن كُلِّ شَيْءٍ مَّوْزُونٍ

“আর পৃথিবীকে আমি বিস্তৃত করেছি, তাতে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু পরিমিতভাবে উৎপন্ন করেছি।”
— সূরা আল-হিজর, ১৫:১৯

এই আয়াত পৃথিবীর বিস্তৃতি, পাহাড় এবং উদ্ভিদজগতের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

পাহাড়ের দৃঢ়তার কথাও এসেছে কোরআনে

পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় প্রকৃতির এক বিস্ময়কর দৃশ্য। কোরআন পাহাড়কে বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

আল্লাহ বলেন,

وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا

“আর পাহাড়গুলোকে পেরেকস্বরূপ (স্থাপন করেছি)।”
— সূরা আন-নাবা, ৭৮:৭

আরেক আয়াতে বলা হয়েছে,

وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ

“তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদের নিয়ে দুলে না যায়।”
— সূরা আন-নাহল, ১৬:১৫

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি কোরআনের বক্তব্যকে আধুনিক ভূতত্ত্বের নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা না করে, আয়াতের নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী পাহাড়কে আল্লাহর সৃষ্টির একটি নিদর্শন ও পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বোঝাই যথাযথ।

নদী, ফলমূল ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্য

প্রকৃতির সৌন্দর্যের আরেকটি বড় নিদর্শন হলো পানি ও উদ্ভিদজগত। একই পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হলেও বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফসল উৎপন্ন হয় কোরআন মানুষকে সেই বৈচিত্র্যের দিকে লক্ষ্য করতে বলে।

আল্লাহ বলেন,

وَفِي الْأَرْضِ قِطَعٌ مُّتَجَاوِرَاتٌ وَجَنَّاتٌ مِّنْ أَعْنَابٍ وَزَرْعٌ وَنَخِيلٌ صِنْوَانٌ وَغَيْرُ صِنْوَانٍ يُسْقَىٰ بِمَاءٍ وَاحِدٍ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلَىٰ بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ

“পৃথিবীতে পাশাপাশি বিভিন্ন ভূখণ্ড রয়েছে, আঙুরের বাগান, শস্যক্ষেত এবং খেজুরগাছ রয়েছে—একাধিক কাণ্ডবিশিষ্ট ও একক কাণ্ডবিশিষ্ট। এগুলো একই পানি দ্বারা সেচপ্রাপ্ত হয়; অথচ ফলের ক্ষেত্রে আমি একটিকে অন্যটির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিই। নিশ্চয়ই এতে বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
— সূরা আর-রাদ, ১৩:৪

এভাবেই কোরআন মানুষকে প্রকৃতির বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়।

ফুল-ফল ও রিজিকের ব্যবস্থা

আল্লাহ পৃথিবী থেকে মানুষের জন্য নানা ধরনের খাদ্য ও ফলমূল উৎপন্ন করেন। কোরআনে বারবার বৃষ্টি, জমিন, শস্য, খেজুর, আঙুর, জলপাইসহ বিভিন্ন ফলের কথা এসেছে।

আল্লাহ বলেন,

فَأَنبَتْنَا فِيهَا حَبًّا ۝ وَعِنَبًا وَقَضْبًا ۝ وَزَيْتُونًا وَنَخْلًا ۝ وَحَدَائِقَ غُلْبًا ۝ وَفَاكِهَةً وَأَبًّا

“অতঃপর আমি তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙুর ও তাজা উদ্ভিদ, জলপাই ও খেজুর, ঘন উদ্যান এবং ফলমূল ও ঘাস।”
— সূরা আবাসা, ৮০:২৭–৩১

প্রকৃতির এই খাদ্যভাণ্ডার মানুষের জন্য আল্লাহর রিজিকের একটি অংশ।

সৃষ্টির সৌন্দর্য মানুষকে স্রষ্টার দিকে আহ্বান করে

কোরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্য উপভোগের বিষয় নয়; বরং তা চিন্তা ও উপলব্ধির মাধ্যম। আকাশ, পৃথিবী, পাহাড়, বৃষ্টি, উদ্ভিদ, ফলমূল এসবের দিকে তাকিয়ে মানুষ আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা উপলব্ধি করতে পারে।

আল্লাহ বলেন,

الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ

“তিনি এমন সত্তা, যিনি তাঁর সৃষ্ট প্রত্যেক বস্তুকে সুন্দর করেছেন।”
— সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:৭

এই আয়াত সৃষ্টির সৌন্দর্য ও সুশৃঙ্খলতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

মানুষের জন্য পৃথিবীর অসংখ্য নিয়ামত

কোরআন জানায়, পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজনীয় বহু কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا

“তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:২৯

এখানে মানুষের জন্য পৃথিবীর সম্পদ ব্যবহারের সুযোগের কথা এসেছে। একই সঙ্গে কোরআনের সামগ্রিক শিক্ষা মানুষকে দায়িত্বশীল হতে শেখায় আল্লাহর নিয়ামত উপলব্ধি করা, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং সীমালঙ্ঘন না করা।

সৃষ্টির সৌন্দর্যের সামনে মানুষের করণীয়

আকাশ-পৃথিবী ও প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে একজন মুমিনের হৃদয়ে শুধু বিস্ময় নয়, আল্লাহর স্মরণও জাগ্রত হয়। কোরআনে সেই চিন্তাশীল মানুষের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে,

الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

“যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে…”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯১

তাই পাহাড় দেখলে শুধু পাহাড় দেখা নয়, নদী দেখলে শুধু নদী দেখা নয়, ফুল ও ফল দেখলে শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করা নয় কোরআনের শিক্ষা হলো এসব সৃষ্টির মধ্য দিয়ে স্রষ্টার নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা।

শেষ কথা

আকাশ ও পৃথিবীর বিশালতা, পাহাড়ের দৃঢ়তা, নদী ও পানির প্রবাহ, সবুজ উদ্ভিদ, ফুল ও ফলের বৈচিত্র্য—সবকিছু মিলিয়ে পৃথিবী মানুষের সামনে এক বিশাল নিদর্শনের জগত।

কোরআনের ভাষায়, এসব সৃষ্টি “বাতিল” বা অর্থহীন নয়। বরং এগুলোর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর কুদরত, প্রজ্ঞা ও নিদর্শন।

“হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি।”   এই উপলব্ধিই একজন মানুষকে প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে স্রষ্টার স্মরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

 

 রেফারেন্স: সূরা আলে ইমরান ৩:১৯০–১৯১; সূরা আল-বাকারা ২:২৯; সূরা আন-নাহল ১৬:১৫; সূরা আর-রাদ ১৩:৪; সূরা আল-হিজর ১৫:১৯; সূরা আন-নাবা ৭৮:৬–৭; সূরা আবাসা ৮০:২৭–৩২; সূরা আস-সাজদাহ ৩২:৭।

আরও