×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 8:37 am


আবারও বাড়ল তেলের দাম, ব্রেন্ট ১০৬ ডলার ছাড়াল

হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ; এক দিনে ব্রেন্ট বেড়েছে ১.৭৪ শতাংশ

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পর সোমবার এশিয়ার বাজারে তেলের দর ঊর্ধ্বমুখী হয়। বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাই দামের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করছে।

সোমবারের লেনদেনে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস ব্যারেলপ্রতি ১.৮২ ডলার বা ১.৭৪ শতাংশ বেড়ে ১০৬.১৪ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা WTI ক্রুডের দাম ১.১৪ ডলার বা ১.২৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৩.৫৫ ডলারে দাঁড়ায়। Reuters-এর বাজার প্রতিবেদনে এসব দর উল্লেখ করা হয়েছে।

হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তাই বড় কারণ

তেলের বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরান চলমান সংঘাতের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার শর্তের সঙ্গে প্রণালিটি পুনরায় চালুর বিষয়টি যুক্ত করেছে। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ট্রাম্প ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) বলছে, ২০২৪ সালে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহন হয়েছে, যা বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। একই সময়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এই পথ দিয়ে গেছে।

গত কয়েক দিনেও ছিল বড় ওঠানামা

হরমুজ নিয়ে আলোচনার খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা গেছে। সম্ভাব্য সমঝোতা ও প্রণালি পুনরায় চালুর আশাবাদ তৈরি হলে তেলের দাম কমেছিল। আবার সংঘাত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে দাম দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

২৪ সেপ্টেম্বর ব্রেন্টের দাম ১০৬ ডলারের ওপরে ওঠে এবং দিনের একপর্যায়ে তা আরও বেশি ছিল। পরদিন কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনার খবরে বাজার কিছুটা স্বস্তি পেলেও সেই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সোমবার ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর আবারও দুই প্রধান বেঞ্চমার্কের দাম বাড়তে শুরু করে।

কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ?

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকদের তেল পরিবহনে এই পথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এই জলপথে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে বিকল্প পথে তেল পরিবহনের সুযোগ থাকলেও তা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বেশি সময় ও খরচসাপেক্ষ। EIA-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানে কিছু বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পরিবাহিত পুরো পরিমাণ তেলের বিকল্প হতে পারে না।

ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলেই শুধু সরবরাহ নয়, পরিবহন ব্যয় ও বাজারের ঝুঁকিও বাড়ে। আর সেই ঝুঁকি অনেক সময় বাস্তবে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক তেলের দামে প্রতিফলিত হয়।

বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, কৃষি ও পণ্য পরিবহনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। কূটনৈতিক সমঝোতা, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া, বিকল্প রপ্তানি পথ সক্রিয় হওয়া কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর মতো কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হলে দাম আবার কমেও যেতে পারে।

নজর এখন হরমুজ ও কূটনৈতিক আলোচনায়

বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা কোন দিকে এগোয়। ইরান বলছে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রয়েছে এবং শর্ত পূরণ হলে হরমুজ পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। ফলে তেলের বাজারে এখন সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতির পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।

বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ১০৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি বাজার কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের পরবর্তী developments-এর ওপর।

আরও