×
×
Sunday, 26 July, 2026, 10:30 am


মাথাপিছু আয় বাড়লেও বৈষম্যের সূচকটি বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে

বিশাল অট্টালিকা, চাকচিক্যময় অফিস কিংবা বিলাসবহুল আবাসিক প্রকল্প শহরের বুকে যখন একের পর এক স্থাপনা মাথা তুলে দাঁড়ায়, তখন তার পাদদেশে যেন এক নতুন পৃথিবীর সৃষ্টি হয়। সেই পৃথিবীতে মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন-বাস্তবতা আর সংগ্রাম সব কিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উন্নয়নের মহারণে কি আদৌ মানবতার স্থান রয়েছে? নাকি আমরা কেবল ইট-পাথরের জটিলতায় হারিয়ে ফেলি মানুষের মুখের সরল সত্য?

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে নগরায়ণের গতি বেড়েছে বহুগুণ। রাজধানী ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহরগুলোতেও গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, শপিং মল, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স। তবে এই নির্মাণঢল যেন এক দিকে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক বৈষম্যের এক প্রকট দর্পণ।

বিপরীত চিত্র:

যখন এক দিকে চিলেকোঠার বাসিন্দারা লিফটে চড়ে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাপন করেন, তখন ওই একই ভবনের নিচে কিংবা পাশের ফুটপাতে দিন কাটে হাজারো নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের অনেকেরই বাড়ি নেই, নেই ঠিকানা। দরিদ্রতা আর অনিশ্চয়তাই যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। রিকশাচালক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, গৃহকর্মী এসব মানুষই শহরের মেরুদণ্ড, অথচ তারাই থাকে উপেক্ষিত।

শুধু আবাসন নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন। উন্নয়নের এই অসম বণ্টন একদিন সামাজিক দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে, যা ইতোমধ্যে অনেক উন্নত দেশেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগরায়ণ ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, “শহর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নয়, মানবিক দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না দিলে এই উন্নয়ন টেকসই হবে না।” তিনি আরও বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলেই কেবল প্রকৃত মানবিক উন্নয়ন সম্ভব।”

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের শহরাঞ্চলে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশই বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বাস করেন। আর এই জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশেরই নেই মৌলিক সেবা পানির নিরাপদ উৎস, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা। অন্যদিকে মাথাপিছু আয় বাড়লেও বৈষম্যের সূচকটি বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

সম্ভাব্য সমাধান:

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাবলয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরায়ণ নীতি গ্রহণ জরুরি। যেমন:

· নিম্নআয়ের মানুষের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত আবাসন প্রকল্প জোরদার করা।

· শহরাঞ্চলে সুলভ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো।

· অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, এমন মানুষদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম চালু করা।

এছাড়া বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রকল্পের আশপাশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা স্বাস্থ্যশিবিরের মতো উদ্যোগ নিতে পারে।

উন্নয়ন কোনো অভিশাপ নয়, এটি মানবসভ্যতার অগ্রগতিরই অংশ। কিন্তু সেই অগ্রগতি যদি কোনো একটি অংশের জন্যই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা কোনোদিনই প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা পায় না। তাই প্রয়োজন শুধু ইট-পাথরের দিকে নয়, মানুষের দিকেও তাকানো। হাই-রাইজের পাদদেশে যারা বসবাস করেন, তারাও এই শহরেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের স্বপ্ন, তাদের সংগ্রাম, তাদের মানবিক মর্যাদা সবই আমাদের যৌথ দায়িত্বের অংশ।

স্মরণ রাখতে হবে, সত্যিকারের উন্নয়ন কেবলমাত্র মাপা হয় জিডিপি বা বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে নয়; তা মাপা হয় একজন সাধারণ মানুষের হাসি, তার সন্তানের স্কুলব্যাগ আর তার বাড়ির ঠিকানার নিশ্চয়তা দিয়ে।

আরও