×
×
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ২:০৭ পূর্বাহ্ণ


ধারণা বা অনুমান সত্যের কাছে মূল্যহীন

وَمَا يَتَّبِعُ أَكۡثَرُهُمۡ إِلَّا ظَنًّاۚ إِنَّ ٱلظَّنَّ لَا يُغۡنِي مِنَ ٱلۡحَقِّ شَيۡئًاۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمُۢ بِمَا يَفۡعَلُونَ

আর তাদের অধিকাংশ কেবল ধারণার অনুসরণ করে। নিশ্চয় সত্যের বিপরীতে ধারণা কোন কার্যকারিতা রাখে না । নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে সে সম্পর্কে সম্যক অবগত। ইউনুস ১০:৩৬

মানুষের বিশ্বাস ও কর্মের পথনির্দেশনার জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআন নাজিল করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তার প্রমাণিত জ্ঞান ও সত্যের ভিত্তিতে নয় বরং অনুমান, ধারণা ও সংশয়ের ওপর নির্ভরশীল। সূরা ইউনুসের ৩৬ নম্বর আয়াতটি মানুষের এই স্বভাবকে চিহ্নিত করে সতর্ক করেছে যে, ধারণা কখনো সত্যের বিকল্প হতে পারে না। এই প্রতিবেদনে আয়াতটির অর্থ ও তাৎপর্য কুরআনের অন্যান্য আয়াতের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হলো।

আয়াতটির তিনটি অংশে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে:
১. অধিকাংশ মানুষ ধারণার অনুসরণ করে।
২. ধারণা সত্যের তুলনায় মূল্যহীন।
৩. আল্লাহ মানুষের সকল কাজ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।

কুরআনের অন্যান্য আয়াতের আলোকে বিশ্লেষণ

১. অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ ধারণার ভিত্তিতে

পবিত্র কুরআনের অন্যত্রও বলা হয়েছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার মানদণ্ড সত্যের মাপকাঠি নয়:

সূরা আল-আন‘আম (৬:১১৬) – “আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মান্য করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা নিছক অনুমানের ওপর কথা বলে।”

এখানে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে, অধিকাংশ লোক ধারণা ও অনুমানের ওপর চলতে অভ্যস্ত, যা তাদের সত্য পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

২. ধারণা কখনো সত্যের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না

আল্লাহ আরও স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ধারণার ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত সত্যের জায়গা নিতে পারে না:

সূরা আন-নাজম (৫৩:২৮) – “আর বিষয়টির কোনো জ্ঞান তাদের নেই। তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে। আর নিশ্চয় ধারণা সত্যের মুখোমুখি কোনো কাজেই আসে না।”

এই আয়াতটি সূরা ইউনুসের আয়াতের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ধারণাকে যদি সত্যের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা ব্যক্তিকে গোমরাহিতে নিয়ে যায়।

৩. ধারণা ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মিথ্যা বিশ্বাস

অনেক সময় মানুষ ধারণার ভিত্তিতে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে বা শিরক করে:

সূরা ইউনুস (১০:৬৬) – “শুনে রাখ! নিশ্চয় আল্লাহরই যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও যা কিছু আছে জমিনে। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অংশীদারদের ডাকে, তারা কী অনুসরণ করে? তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা নিছক অনুমানের ওপর কথা বলে।”

সূরা আল-আন‘আম (৬:১৪৮) – “মুশরিকরা বলবে, ‘আল্লাহ ইচ্ছে করলে আমরা এবং আমাদের বাপ-দাদারা শিরক করতাম না এবং আমরা কিছু হারামও করতাম না।’ এভাবে তাদের পূর্ববর্তীরাও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, অবশেষে তারা আমাদের শাস্তি আস্বাদন করল। বলুন, ‘তোমাদের কাছে কোনো জ্ঞান আছে যা তোমরা আমাদের জন্য বের করতে পারো? তোমরা তো কেবল ধারণার অনুসরণ কর এবং তোমরা নিছক অনুমানের ওপর কথা বল।’”

এখানে মুশরিকদের এই যুক্তি যে “আল্লাহ যদি চাইতেন আমরা শিরক করতাম না” এটি নিছক ধারণা ও অনুমান, কোনো প্রমাণ বা জ্ঞানের ভিত্তি নেই।

৪. আল্লাহ সবকিছুর সম্যক অবগত জ্ঞানের উৎস তিনি

সূরা ইউনুসের মূল আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, “নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” এর মানে মানুষের ধারণার বিপরীতে আল্লাহর কাছে পূর্ণ জ্ঞান ও সত্য রয়েছে:

সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:১৮) – “নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।”

সূরা ফাতির (৩৫:৩৮) – “নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের গায়েব জানেন। নিশ্চয় তিনি অন্তরভেদী সর্বজ্ঞ।”

সূরা আল-মুলক (৬৭:১৪) – “যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী ও সম্যক অবগত।”

সুতরাং আল্লাহর জ্ঞান ও তাঁর প্রদত্ত সত্যের সামনে মানুষের ধারণা সম্পূর্ণ অকেজো।

সূরা ইউনুস (১০:৩৬) এবং কুরআনের অন্যান্য সম্পর্কিত আয়াতগুলি থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে:

১. সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মত ও ধারণা সত্য নির্ধারণের মানদণ্ড হতে পারে না।

২. ধারণা (যান্ন) ও অনুমান কখনো সত্যের (হক) স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না।

৩. মানুষ যেসব বিশ্বাস ও কর্মে ধারণা ও অনুমানের ওপর নির্ভর করে – যেমন শিরক, মিথ্যা আল্লাহর নামে কথা বলা, অন্ধ অনুসরণ – এসবই পরিত্যাজ্য।

৪. একমাত্র আল্লাহ সর্বজ্ঞ, যিনি প্রতিটি কাজের বাস্তবতা ও পরিণতি সম্পূর্ণ জানেন।

৫. একজন মুমিনের কর্তব্য হলো ধারণা ও অনুমান পরিহার করে কুরআনের প্রদত্ত জ্ঞান ও সত্যের ওপর নিজের জীবন গড়া।

এই আয়াতটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যেকোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও পথনির্দেশনার জন্য আল্লাহর কিতাবের জ্ঞানের শরণাপন্ন হতে হবে, আর মানুষের অধিকাংশের ধারনা ও অনুমান পরিত্যাগ করতে হবে।

আরও