×
×
Monday, 27 July, 2026, 10:32 am


বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসঃ ২০২৬ সালে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ২৪%, তৈরি হবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী রেকর্ড

ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ধাক্কা জ্বালানি বাজারকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ “কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক” প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে । এটি ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে জ্বালানি মূল্যের সবচেয়ে বড় বার্ষিক উল্লম্ফন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে । মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুতর বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যার প্রভাব এখন বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

মূল্যস্ফীতির গভীর বিশ্লেষণঃ জ্বালানি থেকে খাদ্য ও ধাতু বাজারে প্রভাব

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে শুধু জ্বালানি নয়, বরং সার ও খনিজ পদার্থের দামেও ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি দেখা যাবে। প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে বলছে, মোট পণ্যদ্রব্যের দাম বর্তমান বছরে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে । এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও সারের খরচ।

উদাহরণস্বরূপ, সারের দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বাড়তে পারে, যার মধ্যে ইউরিয়ার দাম এককভাবে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে । বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রমিত গিল এই প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলেন, “যুদ্ধটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধাপে ধাপে আঘাত করছে: প্রথমে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, তারপর খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বাড়িয়ে ঋণের বোঝা কঠিন করে তুলছে” ।

জ্বালানি সরবরাহ শকে ‘হারমুজ প্রণালি’ সংকটঃ ৩৫% বাণিজ্যে স্থবিরতা

বর্তমান মূল্য সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে হারমুজ প্রণালি। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ বহন করে থাকে । মার্কিন-ইরান সংঘাত তীব্রতর হয়ে ওঠায় এবং এই প্রণালিতে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংক এটিকে ইতিহাসের বৃহত্তম সরবরাহ শকগুলোর একটি হিসেবে অভিহিত করেছে, যা শুরুতে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারের বাইরে চলে যায় । ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই ২০২৫ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে ।

সতর্ক সংকেত: ‘বেস্ট কেস’ অথবা ‘সবচেয়ে ভয়াবহ’ সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাংক যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তা সংঘাত যদি মে মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় এবং অক্টোবরের মধ্যে হারমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেই “ভালো” দৃশ্যপটের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে । এই বেসলাইন দৃশ্যকল্প অনুযায়ী ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম হবে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার (যেখানে ২০২৫ সালে এটি ছিল ৬৯ ডলার) ।

তবে, প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি যদি আরও অবনতি হয়, তাহলে দাম আরও আকাশচুম্বী হতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে (যুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে । বর্তমান পরিস্থিতি যেহেতু অত্যন্ত অনিশ্চিত, তাই দাম বাড়ার ঝুঁকি কমার চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক ।

ভবিষ্যৎ করণীয়ঃ রূপান্তরের জরুরি প্রয়োজনীয়তা

বিদ্যমান এই অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় বসে না থেকে বরং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

খাত বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ভবিষ্যতের পথ ও সুপারিশ (জেপি মরগান, এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল)
জ্বালানি নিরাপত্তা ভূ-রাজনৈতিক কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত; দাম বাড়ার ঝুঁকি “বেশি” । পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু) ও পারমাণবিক শক্তিতে বিনিয়োগ জোরদার ।
বিদ্যুৎ চাহিদা ডেটা সেন্টার (AI) ও বৈদ্যুতায়নের জন্য চাহিদা বেড়ে ২% বৃদ্ধি; পুরনো গ্রিড সংকট । গ্রিড আধুনিকীকরণ ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (ESS) স্থাপনে জরুরি বিনিয়োগ ।
পারমাণবিক শক্তি নিষ্কাশনে অসুবিধা ও দীর্ঘ সময়সীমা (ফিউশনে ২০৪০ সাল) । বর্তমানে ৪১০টির বেশি রিয়্যাক্টর সচল; নিরাপদ ফিউশন প্রযুক্তিতে গবেষণা চালানো ।

বাজারে স্বল্পমেয়াদে এই মূল্য সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে তেলের মজুত ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে । জেপি মরগান ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষকরা একমত যে, পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৌর, বায়ু, ভূ-তাপীয় ও নিউক্লিয়ার শক্তির মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎসগুলোর দিকে দ্রুত রূপান্তর জরুরি, বিশেষ করে AI-চালিত ডেটা সেন্টারগুলোর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ।

আরও