কুরআনের পর আর কোনো আসমানি কিতাবের প্রয়োজন নেই কেন?
লেখক ও গবেষকঃ বারাকাতুল্লাহ
কুরআনুল কারিম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সর্বশেষ এবং পরিপূর্ণ আসমানি কিতাব। এটি এমন এক চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা, যার পর মানবজাতির জন্য আর কোনো নতুন কিতাব প্রেরণের প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না। কুরআনের নিজস্ব বাণী ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আলোকে এই সত্যটি আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে কুরআনের এই চূড়ান্ততা ও পূর্ণাঙ্গতা বিশেষভাবে প্রতীয়মান।
কারণ-১: কুরআনের মূল শব্দের বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্য ও যুগোপযোগী ব্যাখ্যার সম্ভাবনা
আল্লাহ তাঁর কিতাবের শব্দগুলো এতই অর্থবহ ও সুক্ষ্মভাবে বাছাই করেছেন যে আরবি ভাষায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের একাধিক গভীর অর্থ রয়েছে। এসব অর্থের ভিন্নতর প্রয়োগে নতুন যুগের সমস্যার সমাধান বের করা সম্ভব। কুরআনে বারবার চিন্তা-গবেষণার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এর জ্ঞান অফুরন্ত।
কোরআনি দলিল:
“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে না, নাকি তাদের মনে তালা লেগে গেছে?” (সুরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ২৪)
“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? অথচ তা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে আসতো তবে নিঃসন্দেহে তারা এটিতে অনেক পরস্পর-বিরোধিতা পেতো।” (সুরা নিসা, ৪ : ৮২)
উদাহরণ-১: সুরা আলাক (৯৬ : ২) আয়াতে ‘আলাক’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
· অতীত যুগের অনুবাদ: “জমাট বাঁধা রক্ত”
· বর্তমান যুগের ভ্রূণবিজ্ঞানসম্মত অনুবাদ: “ঝুলে থাকা সদৃশ বস্তু” (যা জরায়ুর সাথে সংযুক্ত)
উদাহরণ-২: সুরা আল-ইনশিরাহ (৯৪ : ১) আয়াতে ‘শারহু সাদরিক’ বাক্যটি।
· অতীত যুগের অনুবাদ: “আমরা কি তোমার বক্ষকে উন্মুক্ত করে দেইনি?”
· বর্তমান যুগের স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান অনুসারে অনুবাদ: “আমরা কি তোমার জন্য তোমার সম্মুখ মস্তিষ্কের মনকে উন্মুক্ত করে দেইনি?”
এ ধরনের ব্যাখ্যার সম্ভাবনা প্রমাণ করে কুরআন চিরকালীন ও সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য। তাই নতুন কিতাবের প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন কুরআনের নতুন করে গবেষণার।
কারণ-২: কুরআনের সংরক্ষণ ও রহিতকরণের সঠিক ধারণা
অনেকে মনে করেন, আগের কিতাবের মতো কুরআনের কিছু আয়াতের হুকুম বা তিলাওয়াত রহিত হয়ে গেছে। এটি ভুল ধারণা। কারণ:
১. কুরআনের কোনো আয়াত রহিত, উঠিয়ে নেওয়া বা ভুলিয়ে দেওয়া হয়নি।
আল্লাহ বলেন:
“আমরা যে আয়াতকে রহিত করি বা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম বা অনুরূপ আনি। তুমি কি জান না যে আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান?” (সুরা বাকারা, ২ : ১০৬)
এই আয়াতটি ইহুদি-খ্রিস্টানদের পূর্ববর্তী শরিয়ত রহিত করার প্রসঙ্গে, কুরআনের আয়াত রহিত হওয়ার অর্থে নয়। বরং কুরআন পরিপূর্ণ ও চিরস্থায়ী।
২. কোনো আয়াতের তিলাওয়াত চালু থাকলেও হুকুম চালু নেই—এমন ধারণা ভুল।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে নাযিলকৃত সব আয়াতের তিলাওয়াত ও হুকুম কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে। আল্লাহ বলেছেন:
“নিশ্চয় আমি এই উপদেশগ্রন্থ কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” (সুরা হিজর, ১৫ : ৯)
৩. আগের কিতাবের কিছু বিধান কুরআন দ্বারা রহিত হয়েছে।
এটি নতুন কিতাব পাঠানোর কারণ নয়; বরং এটি কুরআনের চূড়ান্ত ও সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ। আল্লাহ বলেন:
“আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যা পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী ও তার সংরক্ষক।” (সুরা মায়িদা, ৫ : ৪৮)
সিদ্ধান্ত:
কুরআনের পর আল্লাহর আর কোনো কিতাব পাঠানোর প্রয়োজন নেই, কারণ—
১. কুরআনের শব্দভাণ্ডার এত গভীর ও বহুমাত্রিক যে যেকোনো যুগের গবেষণা এর মাধ্যমেই সম্ভব।
২. কুরআন সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত, এর কোনো আয়াত রহিত হয়নি এবং সব হুকুম চিরকালের জন্য প্রযোজ্য।
৩. পূর্ববর্তী কিতাবের বিধান রহিত হওয়া কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের দলিল, নতুন কিতাবের প্রমাণ নয়।
আল্লাহর নির্দেশ:
“আফা লা ইয়াতাদাব্বারুনাল কুরআন” – “তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?” (সুরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ২৪)
আলোচিত দুটি কারণের আলোকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কুরআনুল কারিমের পর আর কোনো আসমানি কিতাব পাঠানোর প্রয়োজন নেই—বরং তা অসম্ভবও। কারণ কুরআনই আল্লাহর চূড়ান্ত, পরিপূর্ণ ও চিরকালীন বাণী।
প্রথমত, কুরআনের মূল শব্দসমূহ আল্লাহ এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন যে সেগুলোর গভীর ও বহুমাত্রিক অর্থ প্রতিটি যুগের জটিল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম। অতএব নতুন কিতাবের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কুরআনকে বারবার নতুন করে চিন্তা-গবেষণা ও যুগোপযোগী ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝার। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
“আমি আমার বান্দার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি যা সবকিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও সুসংবাদ।” (সুরা নাহল, ১৬ : ৮৯, অর্থসহ)
দ্বিতীয়ত, কুরআন সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত। এর কোনো আয়াত রহিত হয়নি, কোনো হুকুম উঠে যায়নি। যা নাযিল হয়েছে, তাই হুবহু কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। আগের কিতাবগুলোর আংশিক রহিত হওয়া কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ, দুর্বলতার নয়।
তাই মুমিনের কর্তব্য হলো—কুরআনকে একমাত্র পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করা, এর শব্দ ও অর্থ নিয়ে গভীর চিন্তা-গবেষণা করা এবং প্রতিটি যুগে এর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গঠন করা। অন্য কোনো কিতাবের অপেক্ষা না করে বরং আল্লাহর এই শেষ বাণীকে আঁকড়ে ধরা।
মহান আল্লাহ বলেন:
“আর এটা একটি বরকতময় কিতাব যা আমি নাযিল করেছি। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।” (সুরা আল-আন‘আম, ৬ : ১৫৫)
পরিশেষে বলা যায়—কুরআনই যথেষ্ট। এটি চিন্তা-গবেষণার জন্য উন্মুক্ত, সংরক্ষণের জন্য আল্লাহর জামানতদার এবং অনুসরণের জন্য পরিপূর্ণ। এর পর আর কিছুই নয়।
আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন।