×
×
Sunday, 13 September, 2026, 4:58 pm


“পহেলা বৈশাখ: সময়ের স্রোতে বাঙালির ঐতিহ্যের গল্প”

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, যা বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের উৎসব হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ই এপ্রিল এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৫ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। ধর্ম-বর্ণ-অঞ্চল নির্বিশেষে এটি বাঙালির সবচেয়ে সর্বজনীন লোকউৎসবে পরিণত হয়েছে।

উৎসবের ইতিহাস ও উৎপত্তি

হিন্দু সৌর পঞ্জিকার প্রভাব

হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাস অনেক প্রাচীনকাল থেকেই পালিত হয়ে আসছিল। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে। আসাম, বঙ্গ, কেরল, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু ও ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নববর্ষ উৎসব অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। তখন এটি মূলত ঋতুধর্মী বা আর্তব উৎসব হিসেবে পালিত হতো, যার সঙ্গে কৃষিকাজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

মুঘল আমলে বাংলা সনের প্রবর্তন

ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদনির্ভর হওয়ায় তা কৃষি ফলনের মৌসুমের সঙ্গে মিলত না। এতে কৃষকদের অসময়ে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হতেন।

এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। তাঁর আদেশে তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের ভিত্তিতে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ‘ফসলি সন’ , পরে তা ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে।

আকবরের সিংহাসন আরোহণের দিন (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর ধরা হয়।

উৎসবের সূচনা ও হালখাতা প্রথা

আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। সে সময় কৃষক ও প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকতেন। পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা তাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন এবং এ উপলক্ষে নানা উৎসবের আয়োজন করা হতো।

এই দিনের প্রধান অনুষ্ঠান ছিল হালখাতা—নতুন হিসাব বই খোলার প্রক্রিয়া। ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন এবং ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এই প্রথা আজও স্বর্ণের দোকানসহ অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত।

পুরান ঢাকায় উৎসবের সূত্র

বাংলা নববর্ষের উৎসবমুখর উদ্যাপনের সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় পুরান ঢাকার মহিফরাস এলাকার বাঙালি মুসলমান মাছ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে। মুঘল আমলে মহিফরাসরা আজিমপুর এলাকায় তাদের নিজস্ব মাঠে চাষাবাদ মৌসুমের সূচনা উপলক্ষে ভোজ ও নৈশভোজের আয়োজন করতেন। এই দিনব্যাপী ভোজ-উৎসবই পরবর্তীতে ঐতিহ্যবাহী পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের পূর্বসূরি হিসেবে বিবর্তিত হয়।

আধুনিক রূপ ও স্বীকৃতি

ছায়ানটের বর্ষবরণ (১৯৬৭)

১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিপীড়নের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ঢাকার রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত “এসো হে বৈশাখ” পরিবেশন করেন, যা আজও এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মঙ্গল শোভাযাত্রা (১৯৮৯)

১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। রঙিন মুখোশ, পেঁচা, বাঘ, মাছসহ নানা প্রতীক বহনকারী এই শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে।

২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

পঞ্জিকা সংস্কার ও তারিখ নির্ধারণ

১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার করে। এর ফলে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ সব সময় ১৪ই এপ্রিল নির্দিষ্ট হয়। পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৫ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়।

পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়:

অনুষ্ঠান বর্ণনা
মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে
রমনা বটমূলে গান ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মিলিত কণ্ঠে বর্ষবরণ
পান্তা-ইলিশ পান্তাভাত ও ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার রেওয়াজ
বৈশাখী মেলা হস্তশিল্প, পিঠাপুলি, নাগরদোলাসহ গ্রামীণ মেলা
হালখাতা নতুন ব্যবসায়িক হিসাব খোলা ও মিষ্টিমুখ করানো
নতুন পোশাক ঐতিহ্যবাহী লাল-সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরিধান

পহেলা বৈশাখ মূলত মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে (১৬শ শতক) কর আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত বাংলা সনের সূচনা থেকেই উৎসবরূপে প্রচলিত হতে শুরু করে। কালের বিবর্তনে এটি কেবল একটি কর আদায়ের দিন নয়, বরং বাঙালি জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। আজ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালি এই দিনটি প্রাণের উচ্ছ্বাসে পালন করে থাকে।

আরও