গ্রামের পুকুরে চিতল মাছ, চাঁদপুরের হামানকর্দ্দি গ্রামের এক পরিবারের মুখে হাসি
চাঁদপুরের সদর উপজেলার হামানকর্দ্দি গ্রাম। গ্রামটির চারপাশে সবুজ ফসলের মাঠ আর ঐতিহ্যবাহী ডাকাতিয়া নদীর শাখা প্রশাখা। প্রকৃতির এমন অনুকূল পরিবেশকে পুঁজি করেই নিজেদের ভাগ্য বদলের গল্প লেখা শুরু করেন এ গ্রামের বাসিন্দা ফকরুল খান (৩৮)। হারিয়ে যাওয়া দেশীয় প্রজাতির চিতল মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। শুধু নিজের সংসারেই স্বচ্ছলতা ফেরেনি, তার এই উদ্যোগ স্থানীয় বেকার যুবকদের জন্য হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার আরেক নাম।
অতীতে শুধু হাওড়-বাঁওড় আর বিলেই চিতল মাছের দেখা মিললেও বর্তমানে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে এই সুস্বাদু মাছটি। কিন্তু ফকরুল খান দেখিয়েছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে পুকুরের মতো বদ্ধ জলাশয়েও সফলভাবে চিতল চাষ সম্ভব। ২০২০ সালে নিজের বাড়ির পাশের ৪০ শতাংশের একটি পুকুরে তিনি চিতল মাছ চাষের উদ্যোগ নেন। শুরুতে পরিবারের অনেকেই বাধা দেন। তাঁদের ধারণা ছিল, পুকুরে চিতল মাছ বাঁচানো যাবে না। কিন্তু ফকরুল খান হাল ছাড়েননি। উপজেলা মৎস্য অফিসের পরামর্শ ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় ।
চাষ পদ্ধতি ও সাফল্যের গল্প
ফকরুল খান চিতল চাষের জন্য মিশ্র চাষ পদ্ধতি বেছে নেন। প্রথমে পুকুরে রুই, কাতলার মতো কার্পজাতীয় মাছ ছাড়ার পর একই সঙ্গে ছাড়েন চিতলের পোনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল চিতলের খাদ্যের ব্যবস্থা করা। যেহেতু চিতল মাংসাশী (Carnivorous) প্রকৃতির, তাই তিনি পুকুরে মা তেলাপিয়া ছাড়েন। তেলাপিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে যে পোনা উৎপাদন করে, তা-ই হয়ে ওঠে চিতলের প্রধান প্রাকৃতিক খাবার। এতে আলাদা করে দানাদার খাবার কেনার খরচ অনেকটাই কমে আসে ।
তার এই পদ্ধতি এখন সফলতার চূড়ায়। মাত্র দুই বছরে পুকুরের প্রতিটি চিতল এখন ২ থেকে ৪ কেজি ওজনের। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি চিতল বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। তার ছোট পুকুরটিতে প্রায় ১০০টির মতো বড় চিতল রয়েছে, যা থেকে তিনি সাফল্য জনক আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন । ফকরুল খানের ভাষায়, “গ্রামের পুকুরে চিতল মাছ চাষ করেই আমার পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছি। এখন শুধু আমি নই, আশপাশের অনেকেই চিতল চাষে আগ্রহী হয়ে আমাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন।”
পরিবারের স্বচ্ছলতা ও আর্থিক সমৃদ্ধি
চিতল চাষের এই সাফল্য ফকরুল খানের সংসারের চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আগে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হলেও এখন তিনটি পুকুরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছেন। সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াতে পারছি। মাছ চাষ আমাদের দিয়েছে আর্থিক নিরাপত্তা।”
শুধু নিজেরাই লাভবান হননি, ফকরুল খানের কাজ করে কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানী ৩-৪ জন বেকার যুবকের। তারাই এখন পুকুর দেখাশোনা, মাছকে খাবার দেওয়া ও অন্যান্য কাজ করে থাকেন। এর মাধ্যমে তারাও স্বাবলম্বী হয়েছেন ।
বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা ফকরুল খানের এই সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এরকম উদ্যোগ শুধু বেকার সমস্যার সমাধানই করছে না, বরং দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ।
ফকরুল খানের এখন স্বপ্ন আরও বড়। তিনি নিজের খামারে চিতলের ব্রুড মাছ (মা মাছ) তৈরি করে পোনা উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন। ভবিষ্যতে এলাকার যুবকদের নিয়ে একটি সমবায় গঠন করে বাণিজ্যিকভাবে চিতল চাষের প্রসার ঘটাতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, সঠিক দিকনির্দেশনা ও সরকারি সহায়তা পেলে চাঁদপুরের প্রতিটি গ্রামেই চিতল চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব ।
হামানকর্দ্দি গ্রামের ফকরুল খান এখন এলাকার গর্ব। তার দেখানো পথেই এখন স্বপ্ন দেখছেন আরও অনেকে—গ্রামের পুকুরে চিতল মাছ চাষ করে বদলে ফেলবেন নিজেদের ভাগ্য।