নিউমুরিং টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নিল ডিপি ওয়ার্ল্ড – কী পাচ্ছে বাংলাদেশ
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে: ১০০০ কোটি বিনিয়োগ, রাজস্ব ভাগাভাগি ও শ্রমিক অসন্তোষ। লাভজনক এনসিটি পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক জায়ান্টের সঙ্গে জিটুজি চুক্তি, ছয় মাসের মধ্যে হস্তান্তর, রাজপথে বাম ও শ্রমিক সংগঠনের বিক্ষোভ।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে পেল দুবাইভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। দীর্ঘ সাত বছরের আলোচনা ও প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে এবং সরকার টু সরকার বা জিটুজি ভিত্তিতে ১৫ বছরের জন্য এই চুক্তি করা হয়েছে।
এই চুক্তিকে ঘিরে একদিকে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রাজপথে নেমেছে প্রতিবাদ। চুক্তির বিরোধিতা করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করেছে বামপন্থী দল ও বন্দর শ্রমিক সংগঠনগুলো।
চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা ও উপস্থিত অতিথিরা
বৃহস্পতিবার ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আয়োজিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে স্বাক্ষর করেন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান এসা কাজিম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। ২০১৯ সালে দুবাই সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল, যা আজ চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নিল।
এনসিটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, কী আছে এই টার্মিনালে
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চালু থাকা চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে আকার ও কর্মক্ষমতায় সবচেয়ে বড় হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। দেশের মোট আমদানি রপ্তানি কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ একাই হ্যান্ডলিং করে এই টার্মিনালটি।
২০০৭ সালে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এখানে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী বড় কনটেইনার জাহাজ এবং একটি ছোট ফিডার জাহাজ ভেড়ানো যায়। শুরুতে আংশিকভাবে এবং পরে পূর্ণাঙ্গভাবে টার্মিনালটি চালু হয়। এতদিন ধরে দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। বর্তমানে এটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড।
গত অর্থবছরের হিসাবে এনসিটিতে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার বা টিইইউএস পরিবহন হয়েছে। এই বিপুল কর্মযজ্ঞের কারণে এনসিটিকে বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চুক্তির শর্ত, বিনিয়োগ ও রাজস্ব ভাগাভাগির মডেল
চুক্তি অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনাভার ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এই ছয় মাসের মধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কয়েকটি আবশ্যক শর্ত পূরণ করতে হবে।
প্রথমত, টার্মিনাল পরিচালনার জন্য স্থানীয়ভাবে একটি কোম্পানি গঠন করে তার সকল কাগজপত্র বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত সমীক্ষা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র জমা দিতে হবে। তৃতীয়ত, বন্দর কর্তৃপক্ষ একজন স্বতন্ত্র প্রকৌশলী নিয়োগ দেবে যিনি টার্মিনালের বর্তমান যন্ত্রপাতি ও সম্পদের অবস্থা যাচাই করে একটি প্রতিবেদন দেবেন। এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই ডিপি ওয়ার্ল্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রথম ১০ বছরে টার্মিনাল আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় ও প্রযুক্তি স্থাপনে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষ এককালীন অগ্রিম ফি হিসেবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পাবে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ টাকা চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ পরিচালনা শুরুর আগে পরিশোধ করা হবে।
এছাড়া প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্ধারিত ফি হিসেবে বন্দরকে দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ইনভেস্ট বাংলাদেশের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কনটেইনার পরিচালনা থেকে গড় আয়ের ভিত্তিতে রাজস্বের স্তরভেদে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত ভাগ পাবে চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে প্রতি একক কনটেইনার থেকে বন্দরের আয় ১৪০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার। এই হিসাবে ৬৭ শতাংশ ভাগ পেলে বন্দরের আয় দাঁড়াবে প্রায় ৯৩ দশমিক ৮০ ডলার থেকে ১০০ দশমিক ৫০ ডলার।
চুক্তিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, বছরে অন্তত ১২ লাখ ৩০ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে হবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। যেহেতু গত বছরই ১৩ লাখ ৮৫ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, তাই এই লক্ষ্য পূরণ করা তাদের জন্য কঠিন হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মাশুলের বিষয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত হারে প্রতি কনটেইনারের মাশুল আদায় হবে। এর বাইরে কোনো অতিরিক্ত বা বিশেষায়িত সেবা দিলে ডিপি ওয়ার্ল্ড অনুমোদিত সার্ভিস চার্জ নিতে পারবে এবং সেই আয়ের একটি অংশও সরকার রাজস্ব হিসেবে পাবে।
মালিকানা কার হাতে থাকবে, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কী
এনসিটি ইজারা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুরো বন্দর বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম স্পষ্ট করে বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মেয়াদে টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। টার্মিনালের জমি, সকল অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। পুরো বন্দর ইজারা দেওয়া এবং একটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়।
তিনি আরও উদাহরণ দেন, পতেঙ্গা টার্মিনাল পরিচালনা করছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান, লালদিয়া টার্মিনালে এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং পিএসএ সিঙ্গাপুরের সঙ্গেও সমঝোতা হয়েছে। বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে আসা দেশের জন্য একটি বড় অর্জন।
টার্মিনালে কর্মরত প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মচারীর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সে বিষয়েও মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, চুক্তির কারণে কোনো শ্রমিকের চাকরি হারানোর বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান কর্মকর্তা কর্মচারীদের তালিকা ও তাদের মোট বেতনের তথ্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে এবং তা বহাল থাকবে। বরং টার্মিনাল আধুনিকায়ন হলে আরও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে। এছাড়া বাংলাদেশের বন্দর সংক্রান্ত সকল আইন বহাল থাকবে এবং কোনো অনিয়ম হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।
চুক্তিকে ঘিরে বিক্ষোভ ও ভিন্নমত
চুক্তি স্বাক্ষরের দিনেই ঢাকা ও চট্টগ্রামে বড় ধরনের প্রতিবাদ দেখা গেছে। গতকাল ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ের বাইরের সড়কে সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি বামপন্থী সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল করে। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
একই দিনে চট্টগ্রামে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে বক্তারা এই চুক্তিকে দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা বাতিল করে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। দাবি না মানলে আগামী সোমবার বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের সামনে অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তারা।
আন্দোলনকারীদের যুক্তি হলো, এনসিটি একটি অত্যন্ত লাভজনক টার্মিনাল। দেশীয় প্রতিষ্ঠানই এটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে। বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হলে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। এই আন্দোলন অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই চলে আসছে।
ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
ব্যবসায়ী সম্প্রদায় অবশ্য এই চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে, তবে তাদের কিছু শর্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চুক্তিতে কী আছে তা বিস্তারিত জানা নেই, তবে আন্তর্জাতিক অপারেটর এলে সেবার মান বাড়বে এটা নিশ্চিত। তবে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে মাশুল না বাড়ে। মাশুল বাড়লে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাবে এবং তার প্রভাব পণ্যের দামের ওপর পড়বে। তিনি আগামীতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় অংশীদার রাখার বাধ্যবাধকতা এবং পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দেশীয় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলম বলেন, খণ্ডিতভাবে যতটুকু জানা গেছে তাতে চুক্তিটি ভালো হয়েছে বলে মনে হয়। তবে ঝুঁকি কে কতটুকু নিচ্ছে সেটা না জেনে পূর্ণাঙ্গ মন্তব্য করা যাবে না। তবে এটা ঠিক যে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য বিদেশি অপারেটররা নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজনেই টার্মিনালগুলো আধুনিকায়ন করবে, যার ফলে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আসবে এবং সেবার মান বাড়বে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলেন, বাণিজ্য ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার এবং জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রেখে বাণিজ্য ও লজিস্টিকস খাতে আরও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, শুধু এনসিটি নয়, বন্দরের বে টার্মিনাল, রেল সংযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থা ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল উন্নয়নে ১০০ কোটি বা এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, টার্মিনালের কর্মদক্ষতা বাড়লে ব্যবসায়ীদের বিলম্ব মাশুল বা ডেমারেজের ব্যয় কমবে। পণ্য খালাসে সময় কম লাগবে। এর ফলে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে, নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে এই চুক্তি বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক মানের সেবা ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং শ্রমিক ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মধ্যে সরকার কতটা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।