×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 7:48 am


বগুড়ায় আগাম শীতকালীন সবজির বাম্পার আবাদ

দেশের সবজি ভান্ডার হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন ও শিমের আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা, ৬ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে কৃষক, ঢাকার বাজারে বাড়ছে সরবরাহ, কারওয়ান বাজার সহ দেশের বড় পাইকারি বাজারে দাম বেশি পেয়ে লাভবান হচ্ছেন তারা

শীত আসার আগেই বাজারে শীতের ঘ্রাণ

বাংলার রান্নাঘরে শীত মানেই নতুন সবজির সমারোহ। কিন্তু এবার ক্যালেন্ডারের পাতায় শীত পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসার আগেই বাজারে চলে এসেছে শীতের আগাম সবজি। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, শ্যামবাজার থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেটের পাইকারি আড়ত পর্যন্ত এখন বগুড়ার আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন আর শিমের দখলে। মাঠ থেকে তোলা টাটকা সবজি ট্রাকে করে প্রতিদিনই ঢাকায় আসছে। ক্রেতারাও বাড়তি দাম দিয়েও কিনছেন শীতের আগাম স্বাদ।

দেশের অন্যতম প্রধান সবজি উৎপাদন অঞ্চল বগুড়ায় এবার আগাম শীতকালীন সবজি চাষে এক ধরনের নীরব বিপ্লব চলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে শুধু আগাম জাতের জন্যই ৫ থেকে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে চারা রোপণ শেষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাকি জমিতেও দ্রুত রোপণ শেষ হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

দেশের সবজি ভান্ডার কেন বগুড়া

বগুড়াকে এমনি এমনি দেশের সবজি ভান্ডার বলা হয় না। এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও মাটিগত কারণ। বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে শিবগঞ্জ, গাবতলী, সারিয়াকান্দি, সদর ও সোনাতলা সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা, মহাস্থান এলাকা সারা দেশে সবজির হাব হিসেবে পরিচিত। এখানকার দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি শীতকালীন সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো এবং করতোয়া ও যমুনা নদীর অববাহিকার উর্বর পলিমাটি ফলন বাড়াতে সাহায্য করে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়ার তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে জেলায় ১৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টন। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার থেকে ৩ লাখ টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের অবদান প্রায় অর্ধেক। রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় এবার ৮২ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার টন শীতকালীন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার মধ্যে বগুড়া জোন একাই ৪২ হাজার ৮৩০ হেক্টরে ১০ লাখ ১৩ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্য বহন করছে।

এবারের লক্ষ্যমাত্রা ও মাঠের বর্তমান চিত্র

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ থেকে ৬ হাজার হেক্টর। কিছু উপজেলাভিত্তিক হিসাবে লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর দেখানো হলেও জেলার সামগ্রিক পরিকল্পনা ৬ হাজার হেক্টরের কাছাকাছি। গত বছরের তুলনায় এবার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।

ইতোমধ্যে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে চারা রোপণ শেষ হয়েছে। মাঠে গেলে এখন দেখা যাবে সারি সারি ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা। কোনো জমিতে চারা সবেমাত্র মাথা তুলছে, কোনো জমিতে আবার ফুল আসতে শুরু করেছে। কৃষকরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে ব্যস্ত। কেউ নিড়ানি দিচ্ছেন, কেউ সেচ দিচ্ছেন, কেউবা জৈব সার প্রয়োগ করছেন।

শিবগঞ্জের মোকামতলার কৃষক শাকিল আহমেদ এবার ২০ শতক জমিতে আগাম সবজি লাগিয়েছেন। তিনি জানান, এবার শরৎকালে বৃষ্টি একটু বেশি হওয়ায় শুরুতে চারা লাগাতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে, নিড়ানি দিতে দেরি হয়েছে। তবে রোদ উঠতে শুরু করায় গাছ দ্রুত সেরে উঠছে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যেই তিনি প্রথম চালান বাজারে তুলতে পারবেন।

কৃষি বিভাগের হিসাবে প্রতি বিঘা জমিতে আগাম সবজি চাষে এখন খরচ হচ্ছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক ও কীটনাশক খরচ অন্তর্ভুক্ত। তবে আগাম বাজারে দাম বেশি থাকায় এই খরচ সহজেই উঠে আসে।

কোন কোন সবজি আসছে আগাম বাজারে

বগুড়ায় এবার যে সব আগাম সবজি বেশি চাষ হচ্ছে তার মধ্যে প্রধান হলো ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, মুলা, শিম, গাজর, টমেটো, লাউ ও বরবটি। এর মধ্যে ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

১. ফুলকপি: আগাম জাতের মধ্যে হোয়াইট মার্বেল, স্নো হোয়াইট, বারি ফুলকপি ১ জাত বেশি চাষ হচ্ছে। এই জাতগুলো ৫৫ থেকে ৬০ দিনে বাজারজাত করা যায়।

২. বাঁধাকপি: গ্রিন করোনেট, এটলাস ৭০ জাতের বাঁধাকপি আগাম চাষের জন্য জনপ্রিয়। ওজন ২ থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত হয়।

৩. বেগুন: উত্তরা, বারি বেগুন ৮ ও ১০ জাতের বেগুন চাষ হচ্ছে। বেগুন গাছ একবার লাগালে ৬ মাস পর্যন্ত ফলন দেয়।

৪. মুলা: তাসাকিসান ও বারি মুলা ১ জাতের মুলা মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনে তোলা যায়। তাই কৃষকরা দ্রুত লাভের জন্য মুলা বেশি লাগান।

৫. শিম: আগাম শিম হিসেবে ইপসা শিম ১ ও ২ এবং বারি শিমের চাষ বাড়ছে। শিমের দাম বাজারে সবসময় বেশি থাকে।

এছাড়া লালশাক, পালংশাক, ধনেপাতার মতো স্বল্পমেয়াদি শাকসবজিও প্রচুর চাষ হচ্ছে।

আগাম চাষের কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

আগাম শীতকালীন সবজি চাষ একটি কৌশলগত বিষয়। সাধারণ শীতকালীন সবজি লাগানো হয় অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরে। আর আগাম সবজি লাগানো হয় ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে, অর্থাৎ আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এই সময় তাপমাত্রা বেশি থাকে এবং বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে, তাই বাড়তি যত্ন নিতে হয়।

কৃষকরা এখন যে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করছেন তা হলো:

প্রথমত, পলিথিন শেডে বীজতলা তৈরি। সরাসরি মাঠে বীজ না ফেলে ছোট পলিথিনের ছাউনির নিচে বীজতলা তৈরি করা হয় যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও রোদ থেকে চারা রক্ষা পায়।

দ্বিতীয়ত, উঁচু বেড পদ্ধতি। জমিতে ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার উঁচু বেড তৈরি করে চারা লাগানো হয় যাতে গোড়ায় পানি না জমে।

তৃতীয়ত, মালচিং পদ্ধতির ব্যবহার। অনেক কৃষক এখন প্লাস্টিক মালচ ব্যবহার করছেন। এতে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়, আগাছা কম হয় এবং ফলন প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ে।

চতুর্থত, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা। কৃষি বিভাগ কৃষকদের রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব বালাইনাশক, ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। এতে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে, যা বিদেশে রপ্তানির জন্যও উপযোগী। বগুড়ার ফুলকপি ও বাঁধাকপি ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

কেন আগাম চাষে লাভ বেশি

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম হলো জোগান কম থাকলে দাম বেশি থাকে। শীতের মূল মৌসুমে যখন বাজারে প্রচুর সবজি থাকে তখন দাম কমে যায়। কিন্তু আগাম মৌসুমে বাজারে সবজির জোগান কম, তাই দাম থাকে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ।

একজন কৃষক হিসাব দিয়ে বলেন, মূল মৌসুমে এক কেজি ফুলকপির পাইকারি দাম থাকে ১৫ থেকে ২০ টাকা, কিন্তু আগাম মৌসুমে সেই ফুলকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এক বিঘা জমিতে যদি ৮০ মণ ফুলকপি হয়, তাহলে মূল মৌসুমে আয় হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা, আর আগাম মৌসুমে আয় হয় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়েও ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লাভ থাকে।

এ কারণেই বগুড়ার অনেক কৃষক এখন ঋণ নিয়ে হলেও আগাম চাষে ঝুঁকছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, আগাম জাতের সবজি চাষে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কৃষকরা। একই জমিতে আগাম সবজি তোলার পর আবার মূল শীতকালীন সবজি বা আলু চাষ করা যায়, ফলে বছরে একই জমি থেকে তিনটি ফসল পাওয়া সম্ভব।

ঢাকার কারওয়ান বাজার সহ দেশজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা

বগুড়ায় উৎপাদিত সবজির প্রধান গন্তব্য ঢাকা। প্রতিদিন ভোর রাতে বগুড়ার মহাস্থান, মোকামতলা, তিনমাথা, শাকপালা ও সাতমাথা এলাকা থেকে ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক সবজি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এই সবজি প্রথমে আসে কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার ও যাত্রাবাড়ী পাইকারি আড়তে। সেখান থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর খুচরা বাজার এবং চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও বরিশাল সহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, বগুড়ার সবজির মান খুব ভালো। আকার বড়, রঙ উজ্জ্বল এবং তাজা থাকে। ঢাকার ক্রেতারা বগুড়ার ফুলকপি ও বাঁধাকপি বেশি পছন্দ করেন। এখন প্রতিদিনই বগুড়া থেকে ২০ থেকে ২৫ ট্রাক আগাম সবজি কারওয়ান বাজারে আসছে।

এই সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে বগুড়ার কৃষকরা সরাসরি ঢাকার বাজারের সঙ্গে যুক্ত। অনেক কৃষক সমবায় সমিতির মাধ্যমে নিজেরাই ট্রাক ভাড়া করে ঢাকায় সবজি পাঠান, ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমেছে।

বর্তমান বাজার দর ও ভোক্তার চাহিদা

রাজধানীর বাজারে এখন আগাম শীতকালীন সবজির দর কিছুটা চড়া। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ফুলকপি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মুলা ৫০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং শিম ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে কৃষক পর্যায়ে দাম এর প্রায় অর্ধেক। এই দামের পার্থক্য পরিবহন খরচ ও বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে হয়।

ভোক্তারা একটু বেশি দাম দিয়েও আগাম সবজি কিনছেন। গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, সারা বছর একই সবজি খেতে খেতে একঘেয়েমি লাগে। শীতের আগাম ফুলকপি দিয়ে মাছ রান্না বা শিম দিয়ে শুটকি ভর্তা খেতে দারুণ লাগে। তাই দাম বেশি হলেও অল্প করে কিনছি।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, আগাম শীতকালীন সবজিতে পুষ্টিগুণ মূল মৌসুমের মতোই থাকে। ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে ও ফাইবার প্রচুর পরিমাণে থাকে। মুলা হজমে সাহায্য করে এবং শিমে প্রচুর প্রোটিন থাকে।

চাষে চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়

আগাম সবজি চাষে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো আবহাওয়া। ভাদ্র আশ্বিন মাসে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে চারা পচে যায়। এবারও শরৎকালে বৃষ্টি বেশি হওয়ায় কিছু এলাকায় চারা নষ্ট হয়েছে। কৃষকরা আবার নতুন করে চারা লাগিয়েছেন।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো রোগবালাই। অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গোড়া পচা, পাতা ঝলসানো রোগ দেখা দেয়। এ জন্য কৃষি বিভাগ থেকে ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো বীজের মান। বাজারে অনেক নকল ও নিম্নমানের বীজ বিক্রি হয়। ভালো বীজ না হলে ফলন কমে যায়। তাই কৃষি বিভাগ বিএডিসি ও নির্ভরযোগ্য কোম্পানির বীজ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হলো সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি। গত এক বছরে সারের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কৃষকদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানানো হচ্ছে এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের সহায়তা ও সরকারি উদ্যোগ

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগাম সবজি চাষিদের জন্য তারা বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে বীজ বিতরণ, ভর্তুকি মূল্যে সার প্রদান, প্রদর্শনী প্লট স্থাপন এবং মাঠ দিবস আয়োজন। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫০০ প্রদর্শনী প্লটে আগাম সবজি চাষ করা হচ্ছে যাতে অন্য কৃষকরা শিখতে পারেন।

এছাড়া কৃষকদের জন্য কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা চালু করা হয়েছে। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে বৃষ্টি ও তাপমাত্রার পূর্বাভাস জানানো হচ্ছে।

সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় অনেক কৃষককে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে অবদান

শুধু বগুড়া নয়, সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় আগাম সবজির গুরুত্ব অপরিসীম। যখন বাজারে সবজির ঘাটতি থাকে তখন আগাম সবজি সেই ঘাটতি পূরণ করে। এটি বাজারকে স্থিতিশীল রাখে এবং সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটায়।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর অবদান বিশাল। বগুড়া জেলায় শুধু শীতকালীন সবজি বিক্রি করে প্রতি বছর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়। এর মধ্যে আগাম সবজির অবদান প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এই টাকা সরাসরি কৃষকের হাতে যায়, ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়।

বগুড়ার সবজি এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। বিশেষ করে বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষ করা ফুলকপি ও বাঁধাকপি মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বগুড়ায় আগাম সবজি চাষের সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি। যদি হিমাগার ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থা আরও উন্নত করা যায়, তাহলে কৃষকরা সবজি সংরক্ষণ করে আরও ভালো দাম পাবেন। বর্তমানে বগুড়ায় পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে সবজি বিক্রি করতে হয়।

এছাড়া খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা গেলে শীতকালীন সবজি দিয়ে আচার, স্যুপ ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করা সম্ভব। সরকার যদি বগুড়ায় একটি বিশেষ সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল গড়ে তোলে তাহলে এই খাত আরও বিকশিত হবে।

কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ফসল বীমা চালু করা গেলে তারা আরও উৎসাহিত হবেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে বীমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেলে কৃষকরা ঝুঁকি নিতে ভয় পাবেন না।

শেষ কথা হলো, বগুড়ার মাঠে যে আগাম শীতের সবজির হাসি ফুটেছে তা শুধু কৃষকের হাসি নয়, এটি সারা দেশের মানুষের পুষ্টি ও অর্থনীতির হাসি। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তা পেলে বগুড়া একদিন সারা এশিয়ার সবজি সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম সবজি চাষ সফল হলে এবার উৎপাদন ১ লাখ টনের বেশি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় একটি বড় অর্জন হবে।

আরও