গ্রাম বাংলার ধান চাষীদের লাভ-ক্ষতির হিসাব
বৈশাখের প্রকট রোদ উপেক্ষা করে কাস্তে হাতে ধান কাটছিলেন মোকছেদ আলী। চাঁদপুরের সীমান্তবর্তী এই গ্রামের ধানক্ষেত এখন সোনালী। শীষভরা ধান দেখে তার মুখে হাসি লেগেই ছিল। গত কয়েক মাসের অবিরাম শ্রমের ফসল এখন ঘরে তোলার পালা। কিন্তু এই হাসি কি ধরে রাখতে পারবেন তিনি? প্রশ্নটা তার গলায় আটকে আছে। কারণ, গত বছরেও এমন ফসল ঘরে তুলে খরচ বাদে লাভের মুখ দেখেননি তিনি।
শুধু মোকছেদ আলী নন, বাংলাদেশের প্রান্তিক ধান চাষীদের এই চিত্র এখন সর্বজনবিদিত। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাত, কৃষি বিভাগের নানান পরামর্শ, ২৪ ঘন্টা হেল্পলাইন সেবা —সবকিছুর পরও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচ ও বিক্রয় মূল্যের টানাপোড়েন। ফসল ফলানোর প্রতিটি স্তরেই যেন খরচের পাহাড় ডেকে এনে হাসি কেড়ে নেয় চাষীদের।
সোনালী ফসলের পেছনে খরচের পাহাড়
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে ধান চাষের খরচ নিয়ে কোনো সরকারি হিসাব নেই, তবে কৃষকদের হিসাবটা খুব সরল। গত ২০২৫-২৬ মৌসুমে বোরো ধান চাষের খরচ নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সাথে কথা বলে উঠে এসেছে চিত্রটি। মোকছেদ আলীর কাছে একটি হিসাব চাওয়া হলে তিনি খাতা কলমে হিসাব দেখান।
“৩৩ শতক (১ বিঘা) জমিতে বোরো ধান চাষ করতে খরচ হয়েছে ১৪ থেকে ২১ হাজার টাকার মতো,” – স্থানীয় কৃষকদের একজন, সাখাওয়াত হোসেন জানান ।
তার দেওয়া হিসাব মতে, শুধু জমি চাষ, বীজ ও চারা রোপণে খরচ হয়েছে ৪ হাজারের বেশি টাকা। সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক, বোরন, ম্যাগনেশিয়াম—সব মিলিয়ে প্রায় ৩-৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে । এর সঙ্গে আছে পোকামাকড় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক বাবদ আরও ১ হাজার টাকা। সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হলো শ্রমিক সংকট ও মজুরি।
“চারা লাগানো, নিড়ানি দেওয়া, ধান কাটা আর মাড়াই—এই তিন কাজেই প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায়। তাই মোট খরচ প্রায় ২১ হাজার টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়,” – বলছিলেন আরেক কৃষক মহির উদ্দিন ।
যদি নিজের জমি না থাকে, তাহলে বিঘাপর্যন্ত জমির লিজ খরচ (প্রায় ৩-৪ হাজার টাকা) যুক্ত হলে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার টাকার কাছাকাছি।
যখন ফসল ফলেও অশ্রু
এত শ্রম আর খরচের পর ফলন কত হয়? সাধারণত ৩৩ শতক জমিতে ফলন হয় ২৫ থেকে ২৮ মণ (প্রায় ৯২০ কেজি থেকে ১,০৩৬ কেজি) । কিন্তু বাজারে ধানের দাম কত? গত কয়েক মৌসুমের হিসাব বলছে, কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম কেজিপ্রতি ২৮ থেকে ৩৪ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে ।
ধরা যাক, একজন কৃষক ২৭ মণ ধান পেলেন এবং বিক্রি করলেন প্রতি মণ ৯০০ টাকা দরে (কেজি প্রতি প্রায় ৩৪ টাকা)। তাহলে তার মোট আয় দাঁড়ায় (২৭ x ৯০০) = ২৪,৩০০ টাকা । অন্যদিকে, তার খরচ ছিল ২১,০০০ টাকা। তাহলে তার чист লাভ দাঁড়ায় মাত্র ৩,৩০০ টাকা। আর জমি লিজ নিয়ে চাষ করলে তো লোকসানের মুখেই পড়তে হয়।
“এবার ব্রি-১০৩ ধান চাষ করে ফলন ভালো হয়েছে, ৪ বিঘায় ৮৮ মণের মতো পেয়েছি। কিন্তু বাজারে দাম ভালো নয়। খরচ বাদে যা থাকে, তা দিয়ে সংসার চলে না। যদি সরকার আরও কিছুটা দাম দিত, বা খরচ কম হতো!” – নাটোরের বড়াইগ্রামের কৃষক তারিক হোসেনের কণ্ঠে হতাশা ।
তিনি জানান, উচ্চ ফলনশীল এই জাতটি চাষ করে ফলন পেয়েছেন বিঘা প্রতি ২২ মণ, যা অন্যান্য জাতের তুলনায় প্রায় ৪ মণ বেশি। কিন্তু তাতেও হাসি ফুটছে না মুখে।
প্রান্তিক কৃষকের দুরবস্থা
ফসল ঘরে তোলার পর দাম না পেয়ে অনেক কৃষক ঋণের বোঝায় জর্জরিত। বীজ, সার, কীটনাশক—সবই কিনতে হয়েছে আগাম বা ধারে। ফসল বিক্রির টাকা দিয়ে সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে হাতে থাকে না কিছুই। অনেকেই মজুদ করার ব্যবস্থা না থাকায় ফসল তোলার পর বাজারে ধান আনতেই বাধ্য হন, যখন দাম সবচেয়ে কম থাকে।
করণীয় কী?
কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; প্রতিটি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে করণীয়:
১. সরকারি সংগ্রহ বৃদ্ধি: সরকার যদি সময়মতো এবং সঠিক মূল্যে (যেমন ঘোষিত ৩৪ টাকা কেজি ) কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনে, তাহলে বাজার স্থিতিশীল থাকে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পান। কিন্তু সংগ্রহ কার্যক্রম প্রায়ই সীমিত থাকে।
২. কৃষি যান্ত্রিকীকরণ: পাওয়ার টিলার, রিপার, কম্বাইন হার্ভেস্টার ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিক খরচ কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি দিতে হবে ।
৩. বিকল্প বাজার সৃষ্টি: কৃষক যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য না হন, সেজন্য কৃষক বাজার বা কৃষি বিপণন কর্পোরেশনকে আরও সক্রিয় করতে হবে।
৪. উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ: সারের বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে এবং কীটনাশকের ভেজাল রোধে কঠোর মনিটরিং জরুরি।
মাঠ থেকে ফসল ওঠার পর মোকছেদ আলীর বাড়ির আঙিনায় ধান শুকানো হচ্ছে। সোনালী রোদে মরেছে ধান। কিন্তু হিসাবের খাতায় এখনও ভাটা পড়েনি তার মুখে। কারণ, কাল সকালেই তাকে ধান বেচতে যেতে হবে স্থানীয় আড়তে। সেখানকার দামের ওপরই নির্ভর করছে, সোনালী এই ফসল শেষ পর্যন্ত তার মুখে হাসি ফোটাতে পারবে কিনা।