×
×
Thursday, 29 October, 2026, 2:53 pm


জ্বালানি সংকট ও বিশ্ব অর্থনীতি: তেল, গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজারে পরিবর্তন (OPEC এর ভূমিকা)

অস্থিরতার জন্ম দেয়া এক ভূ-রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা।
২০২৬ সালের বসন্তে এসে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক নতুন করে জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। মার্কিন-ইসরায়েল জোটের ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাম শৃঙ্খলে এক সুপরিকল্পিত আঘাত । ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুঁশিয়ারি এবং কার্যত সামরিক অভিযান জ্বালানি বাজারকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে । ইতিহাস সাক্ষী থাকে যে, ১৯৭৩ সালের তেল সঙ্কট থেকে শুরু করে ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—প্রতি বড় ভূ-রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় জ্বালানি বাণিজ্যই প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সংকট সেই ধারাবাহিকতারই নবীনতম ও সম্ভাব্য সর্বনাশা অধ্যায়।

এই প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে এই সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে, হরমুজ প্রণালীর মতো প্রাণকেন্দ্রের গুরুত্ব কতটা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উত্থান কি এই ধাক্কা সামলাতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত ওপেক প্লাস জোট তাদের ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তন করছে।

হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক জ্বালানির শিরা-উপশিরা

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ। মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্থ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক তেল চাহিদার ২০% এরও বেশি । শুধু তেল নয়, বিশ্বের তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বিরাট অংশও এই পথে চলাচল করে, যা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের প্রধান রপ্তানি পথ।

২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করা তেলের ৮৪% এবং এলএনজির ৮৩% গন্তব্য ছিল এশিয়ার বাজার । এর মধ্যে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ভারত তার প্রায় অর্ধেক অপরিশোধিত তেল ও ৬০% গ্যাস আমদানি করে এই পথে, আর জাপান তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তেলের জন্য এই পথের উপর নির্ভরশীল । ফলে ইরানের হুঁশিয়ারি বাস্তবায়িত হলে এই দেশগুলো সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে। বর্তমান সংঘাতে হরমুজে ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, বিকল্প কেপ অফ গুড হোপ পথ ব্যবহারে পরিবহন সময় ও খরচ নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে, সাথে যুদ্ধবিমা প্রিমিয়ামও আকাশচুম্বী হয়েছে ।

বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব: মূল্যস্ফীতি ও মন্দার শঙ্কা

জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার অর্থ কেবল পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি নয়; এর প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও ভারী শিল্পে। বর্তমান সংকটে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ইতিমধ্যেই ৮২ ডলার ছাড়িয়ে ১৪% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ । সিটিগ্রুপের বিশ্লেষণ বলছে, টানা ১০ ডলার দাম বৃদ্ধি উদীয়মান বাজারগুলোর মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশাকে সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল করে দিতে পারে, বিশেষ করে আর্জেন্টিনা, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর জন্য ।

লন্ডন-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের পূর্বাভাস, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছতে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে ০.৬ থেকে ০.৭ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করবে । অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA) সতর্ক করে দিয়েছে যে, ২০২৬ সালের মধ্যে দৈনিক ৪ মিলিয়ন ব্যারেল উদ্বৃত্ত তেল থাকার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও, ভূ-রাজনৈতিক শক সেই উদ্বৃত্তকে অকার্যকর করে দিতে পারে । সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে, যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘমেয়াদী জন্য বন্ধ থাকে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামো ধ্বংস হয়, তবে বৈশ্বিক মন্দা অনিবার্য ।

ওপেকের ভূমিকা: টিকে থাকার সংগ্রাম ও কৌশলগত রূপান্তর

ওপেক (OPEC) ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর প্রকৃত ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ১৯৭০-এর দশকে, যখন আরব তেল নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং ওপেক বিশ্ববাজারের অর্ধেক তেল নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে । বর্তমানে ওপেকের ভূমিকা অনেক বেশি জটিল। ২০১৬ সালে গঠিত ওপেক+ জোট রাশিয়াসহ অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশকে নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে । ২০২০ সালের করোনা মহামারিতে অভূতপূর্ব উৎপাদন কমানোর মাধ্যমে এই জোট বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে ।

তবে ওপেকের ভরসা এখন ক্রমশ চ্যালেঞ্জের মুখে। ওয়াশিংটনের পেট্রোলিয়াম রপ্তানি নীতি “ড্রিল, বেবি, ড্রিল” এবং মার্কিন শেল তেল বিপ্লবের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন এতটাই বেড়েছে যে বাজারে ওপেকের প্রভাবশালী অবস্থান ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে । ২০০৮ সালে ওপেকের বৈশ্বিক তেল সরবরাহে অংশ ছিল ৪০% এর বেশি, যেখানে মার্কিন অংশ ছিল ৫%; এখন ওপেকের অংশ ৩৫% এ নেমে এসেছে এবং মার্কিন অংশ ১৭% এ পৌঁছেছে । ফলে বাজারের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ওপেকের প্রতিটি সিদ্ধান্তই এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ওপেকের পক্ষ থেকে উৎপাদন কমানোর পরিবর্তে স্থিতিশীল রাখার সিদ্ধান্ত বিশ্লেষকদের কাছে ইঙ্গিত দেয় যে, ওপেকের হাতে আগের মতো কার্যকর হাতিয়ার নাও থাকতে পারে ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির উত্থান: বিপ্লব নাকি পরিপূরক?

জীবাশ্ম জ্বালানির এই সংকটের মধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এক নতুন শক্তি সঞ্চয় করেছে। ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানিকে ছাড়িয়ে যায় । ২০২৪ সালে বৈশ্বিক নিম্ন-কার্বন বিনিয়োগ রেকর্ড ২.১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। আইজি প্ল্যাটফর্মের বিশ্লেষণ অনুসারে, গত এক বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের রিটার্ন ছিল ২৪%, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের রিটার্ন ছিল মাত্র ২% ।

তবে এই উত্তরণকে তাত্ক্ষণিক সমাধান হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। ইউরোপ ও এশিয়ার মত বড় অর্থনীতিগুলো এখনও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো এখনও পর্যাপ্ত নয় এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিদ্যুৎ খরচ ও শিল্প উৎপাদনে সরাসরি পড়ে। যেমন, সম্প্রতি কাতার তাদের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দাম ৫০% বেড়ে গেছে । এ থেকে বোঝা যায়, নবায়নযোগ্য শক্তি যতই এগোক, স্বল্পমেয়াদে বিশ্ব এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির কাছে জিম্মি। ডিএনবি কার্নেগির প্রধান অর্থনীতিবিদ কিয়ের্স্টি হগল্যান্ড যেমন মন্তব্য করেছেন, সবুজ রূপান্তরের গুণগান গাওয়া যতই হোক না কেন, এখনও “পথ অনেক দীর্ঘ” ।

বহুমুখী সংকট ও অভিযোজনের পথ

সাম্প্রতিক ইরান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি এখনও তেল ও গ্যাসের দামের আকস্মিক ধাক্কা এড়াতে পুরোপুরি সক্ষম নয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধের শঙ্কা যেমন বাস্তব, তেমনি ওপেকের পুরনো কৌশলগুলোও নতুন বাজারে খাটছে না। আমেরিকার উত্থান এবং নবায়নযোগ্য শক্তির অগ্রযাত্রা বাজারের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। কিন্তু জ্বালানি রূপান্তর একটি ধীর প্রক্রিয়া। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জরুরি মজুদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মতো পুরনো পদ্ধতিই কাজে আসবে ।

দীর্ঘমেয়াদে, এই সংকট নবায়নযোগ্য শক্তি ও বহুমুখী জ্বালানি উৎসের দিকে ঝোঁক বাড়াবে, বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতে। কারণ প্রতিটি তেল সংকটই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ জ্বালানি স্বাধীনতা কোনও দেশের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। ওপেকের ভূমিকা হয়তো আগের মতো না থাকলেও, এটি এখনও বৈশ্বিক জ্বালানি বোর্ডরুমের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে থাকবে—যদি তারা নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও বাস্তবতার সাথে মানানসই নীতি গ্রহণ করতে পারে । বর্তমান সংকট সেই সামর্থ্যেরই কঠিন পরীক্ষা নিচ্ছে।

[atn_photocard]
আরও