শান্তির দাবিতে অশান্তির বিষবাষ্প: ইসলামের দৃষ্টিতে এটি সমাজের চারিত্রিক প্রদস্খলন
সমাজ মানে মানুষের সমষ্টি। আর এই সমষ্টিতে শৃঙ্খলা, সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা মানবসভ্যতার শুরু থেকেই চলে আসছে। শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, বরং এটি একটি ইতিবাচক অবস্থা যেখানে মানুষের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিটি মানুষ নিজের পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পায়। ইসলামসহ বিশ্বের সকল প্রধান ধর্ম ও দর্শনই শান্তি ও কল্যাণের এই ধারণাকে গুরুত্ব দেয়।
কিন্তু বাস্তব চিত্র প্রায়ই ভিন্ন। আমাদের আশেপাশে আমরা কিছু লোককে দেখতে পাই, যারা মুখে বলে তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অথচ তাদের কাজকর্ম পুরোপুরি তার বিপরীত। তারা সমাজে ফেতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে, মানুষের মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দেয়, পরস্পরকে অপমানিত করে এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এক ধরণের প্রতারণার আশ্রয় নেয়। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে, এই প্রতারণা তাদের আত্মপ্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই প্রতিবেদনে আমরা এই বিশেষ শ্রেণীর লোকদের মনস্তত্ত্ব, তাদের কর্মকাণ্ডের ধরণ এবং সমাজের ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
শান্তির নামে ফাসাদ: একটি কৌশলী প্রতারণা
যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে শান্তির পক্ষে সওয়াল করে, কিন্তু গোপনে বা কৌশলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তার মধ্যে একটি গভীর দ্বিচারিতা কাজ করে। তাদের এই আচরণকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেখা যেতে পারে:
১. ক্ষমতার লোভ: অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। কারণ, একটি অস্থির সমাজে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং একজন শক্তিশালী নেতার আশ্রয় খোঁজে। এই সুযোগটাই তারা কাজে লাগায় নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে। তারা জানে, প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাবে।
২. ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি: কারও কারও কাছে সামাজিক অস্থিরতা একটি ব্যবসা। ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করে, দুটি পক্ষকে দুর্বল করে, তাদের মধ্যে থেকে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করাই লক্ষ্য থাকে। তারা মানবিক সম্পর্ককে পণ্যে পরিণত করে।
৩. মূল্যবোধের সংকট: এই শ্রেণীর লোকদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের গভীর সংকট কাজ করে। অন্যের কষ্ট, অপমান বা ক্ষতি তাদের বিবেককে বিচলিত করে না। নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্য মানুষ যেন একটি উপকরণ মাত্র। এই উপকরণকে ব্যবহার করে প্রয়োজনমতো ফেলে দেওয়া যায়, আবার প্রয়োজনমতো কাছে টেনে নেওয়া যায়।
৪. অহংবোধ ও হিংসা: অন্যের উন্নতি, শান্তি ও কল্যাণ তাদের সহ্য হয় না। কারও মধ্যে ভালো গুণ দেখলে, তারা তাকে ছোট করার জন্য, তার মানসিক শান্তি নষ্ট করার জন্য নানা অপকৌশল আঁটে। তাদের কাছে অন্যের কল্যাণ মানে নিজের অকল্যাণ।
আল্লাহর সত্য: আত্মপ্রতারণার চূড়ান্ত পরিণতি
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না’, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী।’ সাবধান! তারাই তো ফাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।” (সূরা আল-বাকারা: ১১-১২)
এই আয়াতে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের মানসিকতার একটি চমৎকার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তারা নিজেদের কাজকে সংশোধন বা শান্তি প্রতিষ্ঠা বলে মনে করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আরও বলেন: “তারা আল্লাহকে এবং মুমিনদেরকে প্রতারিত করতে চায়, বস্তুত: তারা নিজেদেরই প্রতারিত করছে, অথচ তারা তা উপলব্ধি করে না।” (সূরা আল-বাকারা: ৯)
আপনার বক্তব্যে এই আয়াতের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই প্রতারণার গভীর অর্থ হলো:
· সীমালঙ্ঘন: তারা আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘন করছে, যা অন্যায় ও অশান্তির মূল কারণ।
· আত্ম-ধোঁকা: তারা মনে করে তারা খুব চালাক এবং তাদের কৌশল সফল হবে। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে আল্লাহ সবকিছু দেখেন এবং তাদের প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে। এই হিসাবের ভয় থেকেই তারা নিজেদের বঞ্চিত করছে।
· অধর্মাচার: যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, অপমান করে এবং ঝগড়া বাঁধায়, তারাই কুরআনের ভাষায় ‘জালেম’ বা সীমালঙ্ঘনকারী। তাদের কাজ কেবল মানুষের সঙ্গে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশিত পথের সাথেই বেইনসাফি।
উত্তম মানসিকতা বনাম জালেম মানসিকতা: একটি তুলনা
সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, অন্যের কল্যাণে চিন্তা করা এবং সামাজিক উন্নয়নে সচেষ্ট থাকা একটি উত্তম মানসিকতার পরিচয়। এই দুই মানসিকতার লোকদের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে:
বৈশিষ্ট্য উত্তম মানসিকতার অধিকারী (সংস্কারক) জালেম মানসিকতার অধিকারী (ফাসাদ সৃষ্টিকারী)
লক্ষ্য সামগ্রিক সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণ ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার
পদ্ধতি ঐক্য প্রতিষ্ঠা, সমস্যার সমাধান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বিভেদ সৃষ্টি, সমস্যা জটিল করা, পরস্পরকে দোষারোপ
অন্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদেরকে সহযোগী ও সম্পদ হিসেবে দেখা অন্যদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ও উপকরণ হিসেবে দেখা
সাফল্যের মাপকাঠি সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধি ফিরে আসা নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা
চূড়ান্ত পরিণতি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের দোয়া আল্লাহর অসন্তুষ্টি, মানুষের অভিশাপ ও আত্মিক শূন্যতা
করণীয়
আমাদের সমাজে এই দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সত্য ও মিথ্যার, শান্তি ও অশান্তির, ন্যায় ও জুলুমের এই লড়াই প্রতিনিয়ত চলছে। কিন্তু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো এই ‘জালেম’ চরিত্রগুলোকে চিহ্নিত করা এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকা।
১. শনাক্তকরণ: শান্তির বুলি আওড়ানো ব্যক্তিদের কাজ দেখে বিচার করতে হবে। তাদের অতীত কর্মকাণ্ড, বন্ধু-বান্ধব এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংকটময় মুহূর্তে তাদের অবস্থান দেখলেই বোঝা যায় তাদের আসল পরিচয়।
২. প্রতিরোধ: এই ফেতনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তাদের কথায় প্ররোচিত না হয়ে, নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।
৩. আত্মশুদ্ধি: আমাদের নিজেদের মধ্যেও এই ধরনের কোনো মানসিকতা আছে কিনা, তা খুঁজে দেখতে হবে। অন্যের কল্যাণ কামনা করা এবং নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে সমাজের মঙ্গলকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
৪. আল্লাহর ওপর ভরসা: জালেমদের প্রতারণা ও অপকৌশলের ভয় না পেয়ে, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জালেমরা কখনো সফলকাম হয় না।
আমরা যদি সত্যিই একটি শান্তিময় সমাজ গড়তে চাই, তাহলে আমাদের মুখের কথা আর কাজের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করতে হবে। নিজেকে বড় করার চেয়ে কাজকে বড় করতে হবে, আর সেই কাজ হতে হবে সবার কল্যাণের। তবেই আমরা আল্লাহর কাছে সত্যিকারের শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে গণ্য দান করুন।