×
×
Sunday, 26 July, 2026, 11:03 am


উচ্ছ্বাস বনাম কল্যাণঃ আমাদের সংস্কৃতির পদস্খলন ও করণীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: আমরা একটি অদ্ভুত সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে বাস করছি। একদিকে আমরা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাফল্যে, বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক বিজয়ে, যেভাবে মেতে উঠি, তাতে মনে হয় যেন আনন্দের আর কোনো সীমা পরিসীমা নেই। রাস্তায় মিছিল, আতশবাজি, মিষ্টি বিতরণ এবং সামাজিক মাধ্যমে উচ্ছ্বাসের বন্যা বয়ে যায়। অথচ অন্যদিকে, যে সৎকর্ম, দৈনন্দিন ছোট ছোট ভালো কাজ মানুষের জীবনকে সহনীয় করে তোলে, জনজীবনকে স্বাভাবিক ও সুন্দর রাখে—সেসব কাজ করার পর আমরা সেই একই রকম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি না, উদযাপন করি না, এমনকি সেগুলোকে আনন্দের উৎস হিসেবেও দেখি না। এটি আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির একটি বড় পদস্খলন, যা থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

*বিজয়ের ‘অস্থির’ উচ্ছ্বাস:*

বিজয় উদযাপন করা খারিজের বিষয় নয়। সাফল্য প্রেরণা জোগায়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই উচ্ছ্বাস প্রায়শই সাময়িক ও অস্থির। এটি কতগুলো কারণে সীমাবদ্ধ থাকে—ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, নির্বাচনী ফলাফল বা কোনো ব্যক্তিগত অর্জন। এই আনন্দ ক্ষণস্থায়ী হলেও এর বহিঃপ্রকাশ এতই প্রকট যে তা জনমনে গেঁথে যায়। এর পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রতিযোগিতায় জয়ের একটা প্রবল তাড়না এবং পরাজিতকে পেছনে ফেলার এক ধরণের তৃপ্তি, যা সব সময় ইতিবাচক নাও হতে পারে।

*সৎকর্মের ‘নীরব’ আনন্দ:*

এর বিপরীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবন জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য সৎকর্মের সম্ভাবনা। রাস্তায় একজন পথচারীকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া, অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো, অসহায়কে আর্থিক বা মানসিক সহায়তা করা, বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা করা, বা নিজের আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা—এসব কাজ আমাদের চারপাশের জনজীবনকে স্বাভাবিক, সহনীয় ও সুন্দর করে তোলে। এগুলো কোনো প্রতিযোগিতা নয়, কোনো ফলাফল নয়, এগুলো মানবিকতার ধারক। এই কাজগুলো করার পরও আমরা সেই আনন্দ লাভ করি, সম্ভবত আরও গভীর ও স্থায়ী এক তৃপ্তি অনুভব করি। কিন্তু সেই আনন্দকে আমরা প্রকাশ করি না, উদযাপন করি না। এটি আমাদের কাছে “গুরুত্বপূর্ণ” কিছু নয় বলে মনে হয়, অথচ সমাজের ভিত এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

*পদস্খলিত সংস্কৃতির কারণ:*

এই সাংস্কৃতিক পদস্খলনের পেছনে কয়েকটি কারণ দায়ী হতে পারে:

১. প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি: আমাদের সমাজ আজ সবকিছুকে প্রতিযোগিতা ও ফলাফলের নিরিখে মাপতে শিখেছে। যে কাজে সাফল্যের মাপকাঠি স্পষ্ট বোঝা যায় (যেমন রান, গোল, ভোট) সেগুলো সহজে চোখে পড়ে। অন্যদিকে সৎকর্মের ফলাফল অমূর্ত, তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে না এবং এর কোনো ‘লিডারবোর্ড’ বা স্কোরকার্ড নেই।

২. স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা: বিজয়ের উচ্ছ্বাস মূলত সামাজিক স্বীকৃতিরই একটা রূপ। মানুষ চায় তার সাফল্য অন্যদের চোখে পড়ুক, প্রশংসিত হোক। অন্যদিকে সৎকর্ম অনেকটাই ব্যক্তিগত ও গোপনীয়তার আবরণে ঢাকা থাকে। প্রকাশ করলে তা ‘দেখানো’ বা ‘প্রদর্শনী’ হয়ে ওঠার ভয় থাকে।

৩. সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব: গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া মূলত চাঞ্চল্যকর, প্রতিযোগিতামূলক ও ‘ভাইরাল’ বিষয়বস্তুকে বেশি প্রাধান্য দেয়। একজন সাধারণ মানুষের ভালো কাজটি সহসাই সেখানে স্থান পায় না, যেখানে একটি তারকা বা রাজনৈতিক নেতার বিজয়ের একটি ছবি হাজার বার শেয়ার হয়।

*বেরিয়ে আসার পথ:*

এই একপেশে সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়তে আমাদের সচেতন প্রচেষ্টা নিতে হবে:

১. দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: আমাদের সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতে হবে যে প্রকৃত আনন্দ শুধু কারও চেয়ে এগিয়ে যাওয়ায় নয়, বরং অপরের জীবনকে সহজ করে তোলার মাঝেও নিহিত। তাদের ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে, তাতে আনন্দ উদযাপন করতে হবে।

২. গুরুত্ব দেওয়া: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে শুধু ফলাফল বা সাফল্যের ভিত্তিতেই নয়, সৎকর্ম ও মানবিক আচরণের ভিত্তিতেও পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৩. মিডিয়ার দায়িত্ব: সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়াকে উল্লসিত বিজয়ের পাশাপাশি মানবতার কল্যাণে নিবেদিত এই নীরব সৈনিকদের গল্পও প্রচার করতে হবে। তাদের আত্মত্যাগ ও ভালো কাজকে আলোচনায় আনতে হবে, যাতে সমাজে তাদের মূল্যায়ন বৃদ্ধি পায়।

৪. অভ্যাস গঠন: আমরা প্রত্যেকে নিজের জীবনে রুটিন করে ফেলতে পারি—দিনে অন্তত একটি ভালো কাজ করব, এবং সেই কাজটির আনন্দ অনুভব করব, হয়তো পরিবারের সঙ্গে তা ভাগ করব। এভাবে ছোট ছোট জায়গা থেকে শুরু করলে ব্যাপক পরিবর্তন সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, সাফল্যের উল্লাস আর সৎকর্মের নীরবতা—এই দুইয়ের মধ্যে যে সুবিশাল ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মানবিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি। যে সংস্কৃতি শুধু বিজয়ীর কপালে তিলক এঁকে দেয়, কিন্তু পথহারা পথিককে সঠিক পথ দেখানোর মূল্যায়ন করতে পারে না, সেই সংস্কৃতি প্রকৃত অর্থে পরিণত নয়। আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই পদস্খলিত সংস্কৃতিকে সংশোধন করা এবং এমন একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে মানুষের জীবনকে সহনীয় ও স্বাভাবিক করাই হবে সবচেয়ে বড় বিজয়।

আরও