কর্পোরেট কর্নার
বস আসলে শত্রু না, বসও মানুষ
কলমে- দারিফ আব্দুল্লাহ
যে চেয়ারটাকে আমরা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি
আপনি কখনো খেয়াল করেছেন, অফিসে সবচেয়ে বেশি গালি কোন চেয়ারটা খায়? বসের চেয়ার।
লাঞ্চ টেবিলে, চায়ের দোকানে, অফিস শেষে রিকশায় – আমাদের সব হতাশা, সব রাগ গিয়ে পড়ে ওই একজন মানুষের উপর। “বসটা একটা জিনিসই”, “উনি কিছু বোঝে না”, “উনার জন্য চাকরিটা ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে” – এই কথাগুলো আমরা প্রায় প্রতিদিন বলি।
কিন্তু একটা প্রশ্ন কি কখনো নিজেকে করেছেন? আপনার বসের বসও কি তাকে নিয়ে ঠিক একই কথা বলে?
সত্যিটা হলো, কর্পোরেট জগতে বস এবং কর্মচারী – এই সম্পর্কটা সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির। আমরা বসকে একটা পজিশন হিসেবে দেখি, মানুষ হিসেবে না। আজকের এই ২০০০ শব্দের প্রতিবেদনে আমরা সেই মানুষটাকে একটু খুলে দেখবো, যে মানুষটা আপনার ছুটির অ্যাপ্রুভাল বাটনে বসে আছে।
কেন আমরা বসকে ভিলেন ভাবি?
এর পেছনে ৩ টা মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে।
১. ক্ষমতার দূরত্ব: বসের হাতে আপনার পারফরম্যান্স রেটিং, আপনার ইনক্রিমেন্ট, আপনার প্রমোশন। যখন একজন মানুষের হাতে আপনার ভবিষ্যৎ এতটা নির্ভর করে, তখন অবচেতনভাবে তার প্রতি একটা ভয় এবং ক্ষোভ তৈরি হয়। এটা খুব স্বাভাবিক।
২. তথ্যের ঘাটতি: আপনি জানেন আপনি রাত ১১ টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। কিন্তু বস জানে তার বস তাকে বলেছে, কাল সকাল ৯ টার মধ্যে রিপোর্ট না দিলে ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হয়ে যাবে। আপনি শুধু আপনার অংশটা দেখেন, বসকে দেখতে হয় পুরো ছবিটা। এই তথ্যের গ্যাপ থেকেই ভুল বোঝাবুঝি।
৩. আমরা ভুলে যাই, বসও একসময় আমাদের জায়গায় ছিল: আজ যে মানুষটা ৫০ জনকে ম্যানেজ করছে, ১০ বছর আগে সেও আপনার মতো এক্সেল শিট নিয়ে হিমশিম খেত, সেও বসের ঝাড়ি খেয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে মন খারাপ করতো।
বসের চেয়ারটা আসলে কতটা ভারী?
আপনি যখন বিকাল ৬ টায় ল্যাপটপ বন্ধ করে বের হয়ে যান, আপনার দিন শেষ। কিন্তু বসের দিন তখনো শেষ হয়নি।
আমি একজন কর্পোরেট ম্যানেজারের একদিনের রুটিন বলি:
সকাল ৮ টায় তার বসের মেসেজ: “আজকের সেলস আপডেট কই?”
সকাল ৯ টায় তাকে টিমকে মোটিভেট করতে হয়, যদিও সে নিজেই মোটিভেটেড না।
দুপুর ১২ টায় তাকে HR এর সাথে বসতে হয়, কেন তার টিমের একজন রিজাইন করেছে তার জবাব দিতে।
বিকাল ৩ টায় ক্লায়েন্টের ঝাড়ি তাকেই খেতে হয়, কারণ টিমের ভুলের দায় তাকেই নিতে হয়।
বিকাল ৫ টায় ম্যানেজমেন্ট মিটিংয়ে তাকে প্রমাণ করতে হয়, তার টিম কেন বেস্ট।
আর রাত ১০ টায় যখন আপনি পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছেন, তখন সে কালকের প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছে।
আমরা বলি “বস তো শুধু অর্ডার দেয়”। না, বস হলো শক অ্যাবজরবার। উপরের সব প্রেশার সে শোষণ করে নেয়, যাতে সেই প্রেশার সরাসরি আপনার উপর না আসে। যে বস এই শক অ্যাবজরবার হতে পারে না, সে-ই টক্সিক বস হয়ে যায়।
কর্পোরেটে ৫ ধরনের বস পাবেন
গত ১০ বছরের কর্পোরেট অভিজ্ঞতা থেকে আমি ৫ ধরনের বস দেখেছি:
১. দ্য গ্রেট মেন্টর: এরা বস কম, শিক্ষক বেশি। এরা আপনাকে ভুল করতে দেবে, কিন্তু ভুল থেকে শিখিয়ে দেবে। এরা মিটিংয়ে আপনার নাম বলবে – “এই আইডিয়াটা ফরিদ দিয়েছে”। এদের টিমে থাকলে আপনার গ্রোথ ২ বছরে ৫ বছরের সমান হবে। এদের সংখ্যা খুব কম, ১০%। পেলে আঁকড়ে ধরে থাকুন।
২. দ্য টাস্ক মাস্টার: এরা খুব ভালো পারফর্মার, কিন্তু ম্যানেজার হিসেবে দুর্বল। এরা ভাবে, সবাই তার মতো কাজ করবে। এরা মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট করে – “এই ফন্ট কেন ১২, ১৪ হবে”। এদের উদ্দেশ্য খারাপ না, কিন্তু এদের সাথে কাজ করলে দম বন্ধ লাগে।
৩. দ্য ফ্রেন্ডলি বস: সবচেয়ে বিপজ্জনক। প্রথমে মনে হবে “কি দারুণ বস”। সবার সাথে আড্ডা, চা খাওয়া। কিন্তু কাজের সময় এরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। পারফরম্যান্স খারাপ হলেও কিছু বলে না, ফলে পুরো টিম ডুবে যায়। বন্ধুত্ব দিয়ে টিম চলে না, লিডারশিপ দিয়ে চলে।
৪. দ্য পলিটিশিয়ান: এরা কর্পোরেট পলিটিক্সের মাস্টার। কাজের চেয়ে কাকে কিভাবে খুশি রাখতে হবে সেটা ভালো জানে। আপনার ভালো কাজের ক্রেডিট নিজে নিয়ে নেবে, আর খারাপ হলে আপনার ঘাড়ে ফেলবে। এদের থেকে দূরে থাকুন, আর সব কাজের প্রমাণ ইমেইলে রাখুন।
৫. দ্য টক্সিক বস: এরা চিৎকার করে, অপমান করে, রাত ২ টায় ফোন দেয়। এরা মনে করে ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করাই লিডারশিপ। মনে রাখবেন, কোন চাকরিই আপনার মানসিক শান্তির চেয়ে বড় না। এমন বসের অধীনে ৬ মাসের বেশি থাকা মানে নিজের ক্যারিয়ার এবং স্বাস্থ্য দুটোই নষ্ট করা।
একজন ভালো বসের ৪ টা গুণ – যেটা আমরা কখনো বলি না
আমরা খারাপ বস নিয়ে অনেক কথা বলি, ভালো বস নিয়ে বলি না। একজন ভালো বস:
ক. ঢাল হয়ে দাঁড়ায়: যখন উপরের মহল থেকে অন্যায্য চাপ আসে, ভালো বস সেটা ফিল্টার করে দেয়। সে বলে না “ম্যানেজমেন্ট বলেছে”। সে বলে “আমরা এটা কিভাবে ভালোভাবে করতে পারি”।
খ. স্পটলাইট দেয়, স্পটলাইট কেড়ে নেয় না: ভালো বস যখন সফলতা আসে, তখন টিমকে সামনে দেয়। আর যখন ব্যর্থতা আসে, তখন নিজে সামনে দাঁড়ায়। খারাপ বস এর উল্টোটা করে।
গ. ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে: সে শুধু ভাবে না “এই মাসের টার্গেট কিভাবে হবে”। সে ভাবে “ফরিদের আগামী ২ বছরের গ্রোথ প্ল্যান কি”। সে আপনাকে নতুন প্রজেক্টে সুযোগ দেয়, যাতে আপনি শিখতে পারেন।
ঘ. মানুষ হিসেবে সম্মান করে: আপনি ছুটি চাইলে সে জিজ্ঞেস করে না “কেন ছুটি”। সে বোঝে আপনারও পরিবার আছে, আপনারও খারাপ দিন আসে।
যদি আপনার বসের মধ্যে এই ৪ টার ২ টাও থাকে, তাহলে আপনি ভাগ্যবান।
বস ম্যানেজমেন্ট – কর্পোরেটের সবচেয়ে বড় স্কিল
বইতে লেখা থাকে “কিভাবে টিম ম্যানেজ করবেন”। কিন্তু কেউ শেখায় না “কিভাবে বস ম্যানেজ করবেন”। অথচ আপনার ৭০% শান্তি নির্ভর করে এই স্কিলের উপর।
১. বসকে কখনো সারপ্রাইজ দেবেন না: খারাপ খবর যত দ্রুত সম্ভব বসকে জানান। বস মিটিংয়ে গিয়ে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে জানলো যে আপনার প্রজেক্টে সমস্যা – এটা আপনার জন্য আত্মঘাতী। আগেই বলুন, “বস, একটা সমস্যা হয়েছে, আমি এভাবে সমাধানের চেষ্টা করছি”।
২. সমাধান নিয়ে যান, সমস্যা নিয়ে না: “বস, এইটা হচ্ছে না” – এটা বলবেন না। বলুন, “বস, এখানে একটা চ্যালেঞ্জ আছে, আমি ২ টা সমাধান ভেবেছি – অপশন A এবং B, আপনার কি মনে হয়?” বসরা সমস্যা পছন্দ করে না, সমাধান পছন্দ করে।
৩. বসের কমিউনিকেশন স্টাইল বুঝুন: কেউ ডিটেইল পছন্দ করে, কেউ সামারি। কেউ সকালে মিটিং পছন্দ করে, কেউ বিকালে। আপনার বস কিভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেটা বুঝে নিন। এটা তেলবাজি না, এটা বুদ্ধিমত্তা।
৪. সবকিছু লিখে রাখুন: মৌখিক নির্দেশনা ভুলে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। মিটিংয়ের পর একটা ছোট ইমেইল করুন – “বস, আজকের আলোচনা অনুযায়ী আমি এই এই কাজগুলো করবো”। এতে ভুল বোঝাবুঝি ৯০% কমে যাবে।
শেষ কথা: একদিন আপনিও বস হবেন
আজ আপনি যে অভিযোগগুলো আপনার বসের বিরুদ্ধে করছেন, একদিন আপনার টিম আপনার বিরুদ্ধে ঠিক একই অভিযোগ করবে, যদি না আপনি এখন থেকে শেখেন। বস হওয়া মানে একটা টাইটেল পাওয়া না, বস হওয়া মানে একটা দায়িত্ব নেওয়া – অনেকগুলো মানুষের ক্যারিয়ার, তাদের পরিবারের হাসির দায়িত্ব।
তাই পরেরবার বসের উপর রাগ হওয়ার আগে ১০ সেকেন্ড ভাবুন – মানুষটা হয়তো আজ সকালে তার বসের কাছ থেকে এমন একটা ঝাড়ি খেয়ে এসেছে, যা আপনাকে সে কখনো বুঝতে দেয়নি। সে হয়তো আপনার চাকরিটা বাঁচানোর জন্য উপরে অনেক যুদ্ধ করছে, যা আপনি জানেনই না।
বস ফেরেশতা না, বসও ভুল করে। বসেরও খারাপ দিন যায়। কিন্তু ভালো বসকে সম্মান করতে শিখুন, আর খারাপ বসের কাছ থেকেও শিখুন – কেমন বস আপনি হতে চান না।
কারণ মনে রাখবেন, মানুষ চাকরি ছাড়ে না, মানুষ বস ছাড়ে। আবার মানুষ চাকরিতে থাকেও বসের জন্যই।
আপনার বস কোন ধরনের? কমেন্টে জানান। আর এই লেখাটা সেই বন্ধুর সাথে শেয়ার করুন, যে প্রতিদিন বসকে নিয়ে বিরক্ত।