×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 10:09 am


বাঘায় বিদেশি ফল চাষে কৃষকের সাফল্য

আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত বাঘা এখন ড্রাগন, মাল্টা ও উচ্চফলনশীল লিচু চাষের নতুন হাব, কম খরচে বেশি লাভে ঝুঁকছেন হাজারো কৃষক

আমের দেশে নতুন ফলের জয়যাত্রা

রাজশাহী জেলার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সারি সারি আমবাগান। কিন্তু সেই চিরচেনা দৃশ্যপটে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন রঙ। রাজশাহীর বাঘা উপজেলা, যা দীর্ঘদিন ধরে আমের জন্য বিখ্যাত, সেখানে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে নানা ধরনের বিদেশি ফল। বিশেষ করে ড্রাগন ফল, মাল্টা এবং চায়না লিচু চাষে এক নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে এই উচ্চমূল্যের ফল চাষে ঝুঁকছেন এবং অল্প সময়ে পাচ্ছেন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ লাভ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক ফল উৎপাদনে বড় উল্লম্ফন ঘটেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ড্রাগন ফলের উৎপাদন ৯,৭৫৪ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১২,৫২২ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে এবং মাল্টার উৎপাদন ১১,০৬৪ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১২,৯২৯ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। এই জাতীয় প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশের যোগান দিচ্ছে রাজশাহী অঞ্চল, বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের বাঘা, গোদাগাড়ী, পবা ও চারঘাট উপজেলা।

কেন বাঘা বিদেশি ফল চাষের জন্য আদর্শ

বাঘা উপজেলার মাটি ও আবহাওয়া বিদেশি ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই অঞ্চলটি বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে পানি ধারণ ক্ষমতা কম এবং শুষ্ক প্রকৃতির দোআঁশ মাটি বেশি। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, ড্রাগন ও মাল্টার মতো ফলের জন্য জলাবদ্ধতা সবচেয়ে বড় শত্রু। বাঘার উঁচু ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পন্ন জমিতে এই ফলগুলো খুব ভালো হয়।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারিয়াম আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পানি স্বল্পতাযুক্ত বরেন্দ্র অঞ্চল মাল্টা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, কারণ এই ফসলে অন্যান্য ফসলের তুলনায় কম পানি ও কম পরিচর্যা প্রয়োজন। একই যুক্তি ড্রাগন ফলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ড্রাগন মূলত ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ, যা কম পানিতেও টিকে থাকতে পারে এবং প্রচণ্ড রোদ সহ্য করতে পারে।

এছাড়া বাঘার কৃষকরা এখন আর প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করছেন না। তারা আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ড্রিপ ইরিগেশন, মালচিং পদ্ধতি, ক্যানোপি ম্যানেজমেন্ট এবং জৈব সার ব্যবহার করছেন, যা ফলন বাড়াতে এবং খরচ কমাতে সহায়তা করছে।

ড্রাগন ফল: বাঘার নতুন সোনা

বিদেশি ফলের মধ্যে বাঘায় সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে ড্রাগন ফল। পাঁচ বছর আগেও এই ফলটি এখানে তেমন পরিচিত ছিল না। এখন বাঘার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে ছোট বড় ড্রাগন বাগান দেখা যা
একজন কৃষক এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০০ থেকে ৩২০টি ড্রাগন পিলার স্থাপন করতে পারেন। প্রতিটি পিলারে চারটি করে চারা রোপণ করা হয়। রোপণের ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যেই ফল আসতে শুরু করে। একটি গাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়, যা এই চাষকে দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক করে তুলেছে। সাধারণত বছরে ৪ থেকে ৫ বার ফল সংগ্রহ করা যায়। এক বিঘা জমি থেকে বছরে ২ থেকে ৩ টন ফল পাওয়া সম্ভব, যার বাজারমূল্য ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে খরচ প্রথম বছর ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকা এবং পরের বছর থেকে মাত্র ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা।

বাঘার আড়ানী ও বাউসা এলাকার কৃষকরা জানান, আগে তারা আমের মৌসুমের পর বেকার বসে থাকতেন। এখন ড্রাগন চাষের কারণে সারা বছর আয় হচ্ছে। এই ফলের চাহিদা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের সুপারশপগুলোতে ব্যাপক, ফলে পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

মাল্টা চাষ: কম খরচে বেশি লাভের হাতছানি

দ্বিতীয় যে ফলটি বাঘার কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে, তা হলো বারি-১ জাতের মাল্টা। এই মাল্টা আকারে বড়, রসালো এবং মিষ্টি। বাজারে এর চাহিদা আকাশচুম্বী।

রাজশাহী অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১১০ বিঘার বেশি জমিতে শুধু গোদাগাড়ী উপজেলাতেই মাল্টা চাষ হচ্ছে এবং বাঘায় এর পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। মাল্টা চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি একবার রোপণ করলে ১৫ থেকে ২০ বছর ফল দেয় এবং বছরে দুইবার ফলন পাওয়া যায়।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, দেশি মাল্টার স্বাদ ও সতেজতার কারণে ভোক্তারা বিদেশি আমদানি করা মাল্টার চেয়ে স্থানীয় মাল্টাকে বেশি পছন্দ করছেন। এতে তারা ভালো দাম পাচ্ছেন। প্রতি কেজি মাল্টা বাগান থেকেই ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করা সম্ভব।

মাল্টা চাষে রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক আবহাওয়ার সাথে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে চারা, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যা এই চাষের প্রসারে বড় ভূমিকা রাখছে।

চায়না লিচু ও বোম্বাই লিচু: ঐতিহ্যের সাথে নতুনের সংমিশ্রণ

রাজশাহী লিচুর জন্য বিখ্যাত হলেও, বাঘায় এখন দেশি লিচুর পাশাপাশি উচ্চফলনশীল বিদেশি জাতের লিচুর চাষ বাড়ছে। এর মধ্যে চায়না-৩, বোম্বাই ও মাদ্রাজি জাত অন্যতম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, রাজশাহী জেলায় চলতি বছর প্রায় ৮২৫ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার লিচুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

চায়না-৩ লিচুর বৈশিষ্ট্য:
এই জাতের লিচু আকারে বড়, বীজ ছোট এবং শাঁস মোটা ও রসালো। এর মিষ্টতা বেশি এবং সংরক্ষণ ক্ষমতা দেশি লিচুর চেয়ে বেশি। ফলে বাজারজাতকরণে সুবিধা হয়। একজন লিচু চাষি জানান, দেশি লিচুর চেয়ে চায়না-৩ লিচুতে দ্বিগুণ লাভ হয়। একটি গাছ থেকে ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বাঘা উপজেলার অনেক চাষি এখন তাদের পুরোনো আমবাগানের মধ্যে সাথী ফসল হিসেবে চায়না লিচুর গাছ লাগাচ্ছেন, যা তাদের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

শুধু তিনটি নয়, বাঘায় হচ্ছে আরও অনেক বিদেশি ফল

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাঘায় শুধু ড্রাগন, মাল্টা ও চায়না লিচুই নয়, আরও অন্তত ১৫ থেকে ২০ প্রজাতির বিদেশি ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো থাই পেয়ারা, থাই কুল, স্ট্রবেরি, কমলা, জাম্বুরা, সৌদি খেজুর, আঙুর, ক্যাপসিকাম, চেরি, মিষ্টি তেঁতুল, থাই পেঁপে, রামবুটান এবং অ্যাভোকাডো।

বাঘার একজন আদর্শ কৃষক তার ৫ বিঘা জমিতে মিশ্র ফল চাষ করছেন। তিনি জানান, তিনি একই জমিতে ড্রাগন, মাল্টা, পেয়ারা এবং পেঁপে চাষ করে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করছেন, যা আগে শুধু ধান বা আম চাষ করে কখনোই সম্ভব ছিল না। এই মিশ্র ফল চাষ পদ্ধতি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করছে এবং কৃষককে এক ফসলের উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দিচ্ছে।

কৃষি বিভাগ ও সরকারি সহায়তা

এই বিপ্লবের পেছনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং হর্টিকালচার সেন্টারের ভূমিকা অপরিসীম। তারা কৃষকদের উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, ভর্তুকি, প্রশিক্ষণ এবং মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে সাইট্রাস ফল চাষ সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের বিনামূল্যে মাল্টা ও কমলার চারা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ড্রাগন চাষের জন্য আধুনিক পিলার তৈরিতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বাজার ব্যবস্থা

বিদেশি ফল চাষ বাঘার অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে। আগে যে ফলগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, এখন তা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে এবং স্থানীয় বাজারে দাম কমছে।

বর্তমানে বাঘা থেকে প্রতিদিন ট্রাক ভর্তি ড্রাগন ও মাল্টা ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী এবং চট্টগ্রামের ফলমন্ডিতে যাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এই ফলগুলোর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সরাসরি বাগান থেকে ফল ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

একটি হিসাব অনুযায়ী, শুধু লিচু চাষ থেকেই রাজশাহী জেলায় প্রায় ৫৬ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। ড্রাগন ও মাল্টা যুক্ত হলে এই অঙ্ক ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

সম্ভাবনা প্রচুর থাকলেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন, ড্রাগন ফলের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি, অনেক ক্ষুদ্র কৃষক তা বহন করতে পারেন না। মাল্টা গাছে কখনো কখনো সাইট্রাস গ্রিনিং রোগ দেখা দেয়। এছাড়া হিমাগারের অভাবে লিচুর মতো পচনশীল ফল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

এই সমস্যা সমাধানে কৃষি বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান, প্রতিটি উপজেলায় কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা তৈরি এবং রপ্তানির জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের কৃষি মডেল বাঘা

রাজশাহীর বাঘা আজ আর শুধু আমের জন্য নয়, বরং একটি সমন্বিত ও আধুনিক ফল চাষের মডেল হিসেবে দেশের সামনে উদাহরণ তৈরি করছে। ড্রাগন, মাল্টা ও চায়না লিচুর সফল চাষ প্রমাণ করেছে যে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সরকারি সহায়তা পেলে বাংলাদেশের মাটিতেই বিশ্বমানের ফল উৎপাদন সম্ভব।

এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাঘা বাংলাদেশের ফল রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে এবং হাজারো বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। কৃষকদের এই সাহসী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের কৃষি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও