হে মানবজাতি, তোমরা একমাত্র তোমাদের রবের ইবাদত করো
পবিত্র কোরআন মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এর প্রতিটি আয়াত মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আহ্বান করে। সূরা আল বাকারার ২১ নম্বর আয়াতটি সেই আহ্বানের এক মহিমান্বিত সূচনা। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতিকে সরাসরি সম্বোধন করে ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। এই প্রতিবেদনে শুধুমাত্র কোরআনের আলোকে এই আয়াতের গভীর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হলো।
হে মানব জাতি! ইবাদাত করো তোমাদের রবের, যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্বে যারা অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের সবার সৃষ্টিকর্তা, এভাবেই তোমরা নিষ্কৃতি লাভের আশা করতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত ২১)
এক সর্বজনীন আহ্বান: হে মানব জাতি
কোরআনের এই আয়াতটি শুরু হয়েছে ইয়া আইয়্যুহান নাস শব্দ দিয়ে যার অর্থ হে মানব জাতি। এটি একটি সর্বজনীন আহ্বান। কোরআনের অনেক স্থানে ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু বলে শুধু মুমিনদের ডাকা হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী নয়, বরং আদম সন্তান মাত্রই এই আহ্বানের অন্তর্ভুক্ত। ধনী গরিব, সাদা কালো, আরব অনারব, শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলের জন্য এই বার্তা সমানভাবে প্রযোজ্য।
কোরআন বলছে, এই আহ্বান কোনো নতুন বিষয় নয়। মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই এই একই আহ্বান চলে আসছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো। (সূরা নাহল, আয়াত ৩৬)
অর্থাৎ নূহ আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সকল নবীর দাওয়াতের মূল সুর ছিল একটিই, তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো। তাই এই আয়াতটি মানবজাতির প্রতি আল্লাহর প্রথম ও প্রধান নির্দেশ।
ইবাদত কী: শুধু নামাজ রোজা নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন পদ্ধতি
আমরা সাধারণত ইবাদত বলতে শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতকেই বুঝি। কিন্তু কোরআনের দৃষ্টিতে ইবাদতের অর্থ অনেক ব্যাপক। ইবাদত শব্দটি এসেছে আবদ শব্দ থেকে যার অর্থ দাস। ইবাদত মানে হলো দাসত্ব করা, চূড়ান্ত বিনয় ও ভালোবাসার সাথে আনুগত্য করা।
কোরআন মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলেছে, আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য। (সূরা জারিয়াত, আয়াত ৫৬)
তাহলে প্রশ্ন আসে, এই ইবাদত কীভাবে করতে হবে? কোরআন এর উত্তরও দিয়েছে। ইবাদত হলো আল্লাহর প্রতিটি আদেশ মানা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা। ব্যবসা বাণিজ্যে সততা রক্ষা করা ইবাদত। পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ করা ইবাদত। মানুষের সাথে ন্যায়বিচার করা ইবাদত। এমনকি রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও ইবাদতের অংশ। কোরআন বলে,
বলো, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবই বিশ্বজগতের রব আল্লাহর জন্য। (সূরা আনআম, আয়াত ১৬২)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে মুমিনের পুরো জীবনটাই ইবাদত। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে আবার ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কাজ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং তার দেওয়া পদ্ধতি অনুযায়ী করা হয়, তবে তাই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
তোমাদের রবের: কেন শুধু আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে
আয়াতে বলা হয়েছে তোমাদের রবের ইবাদত করো। এখানে রব শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রব মানে শুধু সৃষ্টিকর্তা নন। রব হলেন তিনি যিনি সৃষ্টি করেন, লালন পালন করেন, রিজিক দেন, বাঁচিয়ে রাখেন এবং পরিচালনা করেন।
কোরআন রবেরয়ে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে। আল্লাহ প্রশ্ন করেন, তোমাদেরকে কে সৃষ্টি করেছে? এর উত্তর মানুষের ভেতরেই আছে। আল্লাহ বলেন, আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের রিজিক দিয়েছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন, অতঃপর তোমাদের জীবিত করবেন। (সূরা রুম, আয়াত ৪০)
যিনি আমাদের অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্বে এনেছেন, মায়ের গর্ভে আমাদের আকৃতি দিয়েছেন, দুনিয়াতে আলো বাতাস ও খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, তার চেয়ে বেশি ইবাদতের যোগ্য আর কে হতে পারে? কোরআন যুক্তি দিয়ে বলে, যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে ডাকে তারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা মৃত, জীবিত নয়। (সূরা নাহল, আয়াত ২০ ও ২১)
তাই ইবাদত একমাত্র সেই রবের জন্যই হওয়া উচিত যিনি প্রকৃতপক্ষে রব। অন্য কারো ইবাদত করা বিবেক ও যুক্তির পরিপন্থী।
যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন: ইতিহাসের সাক্ষ্য
আয়াতের পরের অংশে আল্লাহ তার রব হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসকে সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্বে যারা অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের সৃষ্টি করেছেন।
এটি একটি শক্তিশালী যুক্তি। আমরা আজ আছি, কাল ছিলাম না। আমাদের বাবা দাদারা ছিলেন, তারাও একদিন ছিলেন না। এই ধারাবাহিকতা আদম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রতিটি প্রজন্মকে কেউ না কেউ সৃষ্টি করেছে। কোরআন প্রশ্ন করে, তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে না। (সূরা তুর, আয়াত ৩৫ ও ৩৬)
কোরআন আরও স্মরণ করিয়ে দেয় যে পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে আল্লাহ কীভাবে সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাদের অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করেছিলেন। নূহের জাতি, আদ জাতি, সামুদ জাতি, ফেরাউনের সম্প্রদায় সবার ইতিহাস কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তাদের সৃষ্টি কর্তাও আল্লাহ ছিলেন। কিন্তু যখন তারা তাদের রবের ইবাদত ছেড়ে দিয়েছিল, তখন তারা ধ্বংস হয়ে গেছে।
সুতরাং এই অংশটি আমাদের দুটি শিক্ষা দেয়। প্রথমত, আমাদের অস্তিত্বের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে ঋণী। দ্বিতীয়ত, আমাদের পূর্ববর্তীদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তারা যদি রবের অবাধ্য হয়ে ধ্বংস হতে পারে, আমরাও পারি।
যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো: ইবাদতের চূড়ান্ত লক্ষ্য
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, লা আল্লাকুম তাত্তাকুন। যাতে তোমরা নিষ্কৃতি লাভের আশা করতে পারো বা যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। তাকওয়া শব্দটি কোরআনের একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। এর অর্থ হলো আল্লাহকে ভয় করে চলা, সচেতন থাকা এবং নিজেকে পাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখা।
ইবাদতের উদ্দেশ্য শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে তাকওয়া তৈরি করা। কোরআন রোজার বিধান দেওয়ার সময়ও একই কথা বলেছে, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)
তাকওয়া কী? কোরআন নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছে। সূরা বাকারার শুরুতেই মুত্তাকিদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। যারা অদেখা বিষয়ের ওপর ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে, আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। (সূরা বাকারা, আয়াত ৩)
অর্থাৎ তাকওয়া হলো এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়। কোরআন বলে, আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এবং নিজেকে খারাপ কামনা থেকে বিরত রেখেছে, জান্নাতই হবে তার আবাস। (সূরা নাজিয়াত, আয়াত ৪০ ও ৪১)
যখন একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে তার রবের ইবাদত করে, তখন তার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়। সে বুঝতে পারে আল্লাহ তাকে দেখছেন। ফলে সে প্রকাশ্যে ও গোপনে পাপ থেকে বেঁচে থাকে। এটাই হলো নিষ্কৃতি বা মুক্তি। দুনিয়ার লাঞ্ছনা, পরকালের শাস্তি এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তিই হলো প্রকৃত সফলতা।
কোরআনের অন্যান্য আয়াতের আলোকে এই আয়াতের বিস্তার
এই একটি আয়াতকে বুঝতে হলে কোরআনের অন্যান্য আয়াতের সাহায্য নিতে হয়। কোরআনের একটি অংশ অন্য অংশের ব্যাখ্যা করে।
আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারার পরের আয়াতেই রবের আরও পরিচয় দিয়েছেন। যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না। (সূরা বাকারা, আয়াত ২২)
এই আয়াতটি ২১ নম্বর আয়াতের যৌক্তিক ধারাবাহিকতা। কেন আমরা আল্লাহর ইবাদত করব? কারণ তিনি আমাদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করেছেন, মাথার ওপর সুরক্ষিত ছাদ হিসেবে আকাশ দিয়েছেন, বৃষ্টি দিয়ে আমাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। যে রব এতসব নিয়ামত দিলেন, তার সাথে অন্য কাউকে শরিক করা কত বড় অকৃতজ্ঞতা।
কোরআন আরও বলে, তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না। (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ৩৪) আমাদের চোখ, কান, হৃদয়, অক্সিজেন, পানি সবই তার দান। তাই কৃতজ্ঞতার দাবি হলো একমাত্র তারই ইবাদত করা।
আধুনিক জীবনে এই আয়াতের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের আধুনিক বিশ্বে মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছে। কিন্তু মানসিক অশান্তি, হতাশা ও উদ্বেগও বেড়েছে। এর কারণ মানুষ তার রবকে ভুলে গেছে। মানুষ টাকার ইবাদত করছে, ক্ষমতার ইবাদত করছে, নিজের প্রবৃত্তির ইবাদত করছে। কোরআন এই অবস্থার কথা আগেই বলেছে, তুমি কি তাকে দেখেছ যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? (সূরা ফুরকান, আয়াত ৪৩)
যখন মানুষ সৃষ্টিকর্তার ইবাদত ছেড়ে সৃষ্টির ইবাদত শুরু করে, তখনই তার জীবনে বিশৃঙ্খলা নেমে আসে। একজন মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার একজন রব আছেন যিনি তাকে দেখছেন, তার রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন, তার বিপদে সাহায্য করবেন, তখন তার হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। কোরআন বলে, জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়। (সূরা রাদ, আয়াত ২৮)
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য আছে। আমরা এমনি এমনি সৃষ্টি হইনি। আমাদের ফিরে যেতে হবে আমাদের রবের কাছে। তাই দুনিয়ার মোহে পড়ে রবকে ভুলে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
মুক্তির একমাত্র পথ
সূরা বাকারার ২১ নম্বর আয়াত মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন রোডম্যাপ। এটি আমাদের বলে দেয় আমরা কে, কোথা থেকে এসেছি, আমাদের কী করা উচিত এবং এর পরিণতি কী হবে।
আমরা আল্লাহর সৃষ্টি। আমাদের পূর্বপুরুষরাও তারই সৃষ্টি ছিলেন। আমাদের সবার উচিত একমাত্র তারই ইবাদত করা। আর এই ইবাদতের মাধ্যমেই আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারব। আর তাকওয়াই হলো দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সফলতার চাবিকাঠি।
কোরআন শেষ পর্যন্ত একটি চূড়ান্ত সফলতার সংজ্ঞা দিয়েছে, যে ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সেই প্রকৃত সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
সুতরাং হে মানব জাতি, আসুন আমরা আমাদের রবের দিকে ফিরে আসি। তার ইবাদতে নিজেদের জীবনকে সাজিয়ে তুলি। এতেই রয়েছে আমাদের নিষ্কৃতি ও চিরস্থায়ী কল্যাণ।