হেদায়াত গ্রহণ করে কারা?
কোরআনের আলোকে সত্যের আহ্বান, উপদেশ গ্রহণ এবং অদৃশ্য আল্লাহর প্রতি ভয়
মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করা, ভুল থেকে সতর্ক করা এবং সঠিক পথের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া নবী-রাসুলদের দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কোরআন জানায়, সত্যের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হলেও সবাই তা গ্রহণ করবে না। কেউ উপদেশ শুনে সাড়া দেবে, আবার কেউ সতর্কবার্তা পেয়েও নিজের অবস্থানে অটল থাকবে।
সূরা ইয়াসিনের ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে মানুষের এই দুই ধরনের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন,
وَسَوَآءٌ عَلَيْهِمْ ءَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ ١٠
অর্থ: “তুমি তাদেরকে সতর্ক করো বা না করো, তা তাদের জন্য সমান, তারা ঈমান আনবে না।”
সূরা ইয়াসিন, ৩৬:১০
এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا تُنذِرُ مَنِ ٱتَّبَعَ ٱلذِّكْرَ وَخَشِىَ ٱلرَّحْمَٰنَ بِٱلْغَيْبِ فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَأَجْرٍ كَرِيمٍ ١١
অর্থ: “তুমি তো তাকেই সতর্ক করতে পারো, যে উপদেশ মেনে চলে এবং না দেখে পরম দয়াময়কে ভয় করে। অতএব তাকে ক্ষমা ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের সুসংবাদ দাও।”
সূরা ইয়াসিন, ৩৬:১১
সতর্কবার্তা শুনলেই পরিবর্তন আসে না
১০ নম্বর আয়াতে এমন এক শ্রেণির মানুষের কথা বলা হয়েছে, যাদের কাছে সতর্ক করা বা না করা একই বিষয়। অর্থাৎ তাদের অন্তর সত্য গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত নয়। ফলে সত্যের আহ্বান তাদের কাছে পৌঁছালেও তারা ঈমানের পথে এগিয়ে আসে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সত্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি আর তা গ্রহণ করার বিষয়টি এক নয়। একজন মানুষকে সঠিক পথের কথা জানানো যেতে পারে, তাকে সতর্ক করা যেতে পারে, তার সামনে সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু সেই সত্য গ্রহণের জন্য মানুষের নিজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কাদের সতর্কবার্তা উপকার করে?
পরের আয়াতেই কোরআন বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। আল্লাহ বলেন, সতর্কবার্তা তার জন্য ফলপ্রসূ, “যে উপদেশ মেনে চলে” এবং “না দেখে পরম দয়াময়কে ভয় করে”।
অর্থাৎ একজন মানুষের মধ্যে সত্য গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সে উপদেশকে গুরুত্ব দেয়। কেবল শোনা নয়, বরং উপদেশ অনুসরণ করার মানসিকতাও তার মধ্যে থাকে।
কোরআনের ভাষায়,
مَنِ ٱتَّبَعَ ٱلذِّكْرَ
অর্থাৎ, “যে উপদেশ মেনে চলে।”
এখানে আয-যিকর বা ٱلذِّكْرَ শব্দটি স্মরণ, উপদেশ বা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার অর্থ বহন করে। আর ইত্তাবা‘আ বা ٱتَّبَعَ** অর্থ অনুসরণ করা, অনুসরণ করে চলা।
ফলে আয়াতের বক্তব্য শুধু কান দিয়ে সত্য শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সত্যকে গ্রহণ করে তার অনুসরণ করার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত।
অদৃশ্য অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা
আয়াতের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি আরও গভীর। আল্লাহ বলেন,
وَخَشِىَ ٱلرَّحْمَٰنَ بِٱلْغَيْبِ
অর্থাৎ, “এবং না দেখে পরম দয়াময়কে ভয় করে।”
মানুষ সাধারণত যা চোখে দেখে, তা সহজেই বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু কোরআন এমন এক ঈমানের কথা বলে, যেখানে মানুষ আল্লাহকে না দেখেও তাঁর প্রতি বিশ্বাস ও ভয় ধারণ করে।
এ ভয় আতঙ্কের অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর মহত্ত্ব সম্পর্কে সচেতনতা, তাঁর প্রতি সম্মান, তাঁর নির্দেশ মেনে চলার মানসিকতা এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা।
অর্থাৎ সত্যিকারের সতর্কতা গ্রহণের জন্য শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অন্তরের সচেতনতা এবং আল্লাহর প্রতি জবাবদিহির অনুভূতি।
সতর্কবার্তার পর রয়েছে সুসংবাদ
১১ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ এমন মানুষকে সুসংবাদ দিতে বলেছেন। সেই সুসংবাদ হলো,
فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَأَجْرٍ كَرِيمٍ
অর্থাৎ, “তাকে ক্ষমা ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের সুসংবাদ দাও।”
এখানে কোরআনের বক্তব্যে দুটি বিষয় একসঙ্গে এসেছে: মাগফিরাত এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রতিদান।
মানুষ যখন সত্যের উপদেশ গ্রহণ করে, আল্লাহকে না দেখেও তাঁর প্রতি ভয় রাখে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, তখন তার জন্য আল্লাহর ক্ষমা ও সম্মানজনক পুরস্কারের সুসংবাদ রয়েছে।
দুটি আয়াতের মূল শিক্ষা
সূরা ইয়াসিনের ১০ ও ১১ নম্বর আয়াত পাশাপাশি পড়লে মানুষের সামনে সত্য গ্রহণের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা স্পষ্ট হয়।
একদিকে এমন মানুষ রয়েছে, যাদের কাছে সতর্ক করা হলেও তারা ঈমান আনে না। অন্যদিকে এমন মানুষ রয়েছে, যারা উপদেশ অনুসরণ করে এবং অদৃশ্য অবস্থায়ও পরম দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে।
অর্থাৎ একই সত্যের আহ্বান মানুষের কাছে পৌঁছালেও সবার প্রতিক্রিয়া এক হয় না। পার্থক্য তৈরি হয় মানুষের অন্তরের অবস্থান, উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা এবং আল্লাহর প্রতি তার বিশ্বাস ও সচেতনতার মাধ্যমে।
কোরআনের এই বক্তব্য তাই শুধু অন্যকে সতর্ক করার বিষয় নয়; বরং নিজের অবস্থান যাচাই করারও আহ্বান। আমরা কি সত্যের কথা শুনে তা অনুসরণ করি? আমরা কি আল্লাহকে না দেখেও তাঁর প্রতি সচেতন থাকি? নাকি সত্যের সতর্কবার্তা আমাদের কাছে পৌঁছালেও তা আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনে না?
সূরা ইয়াসিনের এই দুই আয়াত পাঠককে সেই আত্মজিজ্ঞাসার দিকেই নিয়ে যায়।
সূরা ইয়াসিন ৩৬:১০-১১-এর শিক্ষা হলো: সত্যের বার্তা পৌঁছানো একটি বিষয়, আর সেই বার্তা গ্রহণ করে জীবন পরিবর্তন করা আরেকটি বিষয়। কোরআন সেই মানুষকেই সুসংবাদ দিয়েছে, যে উপদেশ অনুসরণ করে এবং অদৃশ্য অবস্থায়ও পরম দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে।**