×
×
Tuesday, 27 October, 2026, 9:26 am


কোরআনের পরিচয় কী..?

আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু হওয়া এই দুই আয়াতে উঠে এসেছে কোরআনের উৎস, বক্রতাহীনতা, সঠিক পথনির্দেশ, সতর্কবার্তা ও মুমিনদের জন্য সুসংবাদের কথা

মানুষ যখন কোনো একটি কিতাবের পরিচয় জানতে চায়, তখন সাধারণত জানতে চায়, এই কিতাব কার, কেন এটি এসেছে এবং এর উদ্দেশ্য কী। কোরআন নিজেই তার পরিচয় দিতে গিয়ে সূরা আল কাহফের শুরুতে এমন কিছু কথা বলেছে, যার মধ্যে কোরআনের উৎস, বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের জন্য এর উদ্দেশ্য একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।

সূরা আল কাহফের প্রথম আয়াত শুরু হয়েছে আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে। এরপর জানানো হয়েছে, আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন এবং সেই কিতাবে কোনো বক্রতা রাখেননি। দ্বিতীয় আয়াতে কিতাবটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য এবং এর উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও সঠিক, যার মাধ্যমে কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হয় এবং ঈমান ও সৎকর্মে থাকা মানুষকে উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ দেওয়া হয়।

শুরুতেই কেন আল্লাহর প্রশংসা?

সূরা আল কাহফের প্রথম শব্দ:

الْحَمْدُ لِلَّهِ
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

এরপরই এসেছে:
الَّذِي أَنْزَلَ عَلَىٰ عَبْدِهِ الْكِتَابَ
অর্থ: যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন।

কোরআন তার পরিচয়ের শুরুতেই মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কিতাবটি কার পক্ষ থেকে এসেছে, তার উত্তরও আয়াতের মধ্যেই রয়েছে। আল্লাহই সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন।

এখানে কোরআনকে মানুষের তৈরি কোনো বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং প্রথম আয়াতেই এর উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে।

কোরআনের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি এমন একটি কিতাব যা আল্লাহ নাজিল করেছেন।

আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন
আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ এসেছে
عَبْدِهِ
উচ্চারণ: আবদিহি
অর্থ: তাঁর বান্দা।
এরপর এসেছে:
الْكِتَابَ
উচ্চারণ: আল কিতাব
অর্থ: কিতাব বা গ্রন্থ।
অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন। এই বক্তব্যের মধ্যেই কোরআনের উৎস এবং নাজিল হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরআনের প্রথম আয়াত পাঠ করলে তাই একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে সামনে আসে। মানুষকে কোরআনের পরিচয় জানাতে গিয়ে প্রথমেই তার উৎসের কথা বলা হয়েছে।
কোরআনে কোনো বক্রতা নেই
এরপর আল্লাহ বলেন:
وَلَمْ يَجْعَلْ لَهُ عِوَجًا
উচ্চারণ: ওয়া লাম ইয়াজআল লাহু ইওয়াজা
অর্থ: এবং তিনি তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি।
এখানে عِوَجًا শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। এর অর্থ বক্রতা বা বাঁক।

কোরআন নিজেই ঘোষণা করছে যে, আল্লাহ যে কিতাব নাজিল করেছেন, তাতে তিনি কোনো বক্রতা রাখেননি। অর্থাৎ কোরআনের পরিচয়ের সঙ্গে তার বক্রতাহীনতার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।

এটি কোরআনের নিজের বক্তব্য। তাই সূরা আল কাহফের প্রথম আয়াত থেকেই কোরআন সম্পর্কে একটি মৌলিক বিষয় জানা যায়: আল্লাহর নাজিল করা এই কিতাবে কোনো বক্রতা নেই।

একটি আয়াত শেষ হচ্ছে, কিন্তু বক্তব্য শেষ হচ্ছে না
সূরা আল কাহফের দ্বিতীয় আয়াতের শুরু:
قَيِّمًا
উচ্চারণ: কাইয়্যিমান
অর্থ: সোজা, সুপ্রতিষ্ঠিত ও সঠিক।
প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, কিতাবে কোনো বক্রতা নেই। দ্বিতীয় আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে, এটি قَيِّمًا, অর্থাৎ সোজা ও সুপ্রতিষ্ঠিত।

এখানে প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতের বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রথমে কিতাবের বক্রতাহীনতার কথা এসেছে। এরপর তার সঠিক ও সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

 

কোরআন কেন নাজিল হয়েছে?

দ্বিতীয় আয়াতে কোরআনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে:
لِّيُنذِرَ بَأْسًا شَدِيدًا مِّن لَّدُنْهُ
অর্থ: যাতে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করেন।
এখানে لِّيُنذِرَ শব্দটি এসেছে। এর অর্থ সতর্ক করা।

অর্থাৎ কোরআনের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সতর্ক করা। মানুষকে পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে।

এই সতর্কবার্তাকে কোরআন নিজেই بَأْسًا شَدِيدًا, অর্থাৎ কঠিন শাস্তির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
তাই সূরা আল কাহফের দ্বিতীয় আয়াতের আলোকে কোরআনের একটি উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট: মানুষকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করা।

কোরআন শুধু সতর্ক করে না, সুসংবাদও দেয়
একই আয়াতে সতর্কবার্তার পরই এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
وَيُبَشِّرَ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ: এবং মুমিনদের সুসংবাদ দেওয়া।
এখানে কোরআনের বক্তব্যের আরেকটি দিক প্রকাশ পেয়েছে।

একদিকে সতর্কবার্তা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে সুসংবাদ।
আয়াতটি শুধু মুমিন বলেই থেমে যায়নি। এরপর বলা হয়েছে:
الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ
অর্থ: যারা সৎকর্ম করে।

অর্থাৎ এখানে মুমিনদের এমন একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, যারা সৎকর্ম করে। এরপর তাদের জন্য কী রয়েছে, তাও স্পষ্ট করা হয়েছে।

 

ঈমান এবং সৎকর্ম
সূরা আল কাহফের দ্বিতীয় আয়াতের এই অংশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ:
الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ
অর্থ: মুমিনদের, যারা সৎকর্ম করে।

কোরআনের এই আয়াতে মুমিনদের পরিচয়ের সঙ্গে সৎকর্মের কথা এসেছে।
এরপর আল্লাহ বলেন:
أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا حَسَنًا
অর্থ: নিশ্চয়ই তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।

অর্থাৎ আয়াতের ধারাবাহিকতা হলো:
কিতাব নাজিল হয়েছে।
কিতাবে কোনো বক্রতা নেই।
এটি সোজা ও সুপ্রতিষ্ঠিত।
এটি সতর্ক করে।
এটি সুসংবাদ দেয়।
যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।
এই ধারাবাহিকতা সূরা আল কাহফের প্রথম দুই আয়াতেই স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

কোরআনের বার্তায় সতর্কতা ও সুসংবাদ পাশাপাশি

কোরআনের প্রথম দুই আয়াতের একটি লক্ষণীয় দিক হলো, এখানে শুধু ভয় দেখানোর কথা নেই এবং শুধু সুসংবাদের কথাও নেই।

একই আয়াতে দুই ধরনের বার্তা এসেছে।

প্রথমটি সতর্কবার্তা।
দ্বিতীয়টি সুসংবাদ।

আল্লাহ বলেন, কিতাবের মাধ্যমে কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হবে। আবার যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ দেওয়া হবে।
অর্থাৎ এই দুই আয়াত কোরআনের বক্তব্যের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রের সূচনা করে।

উত্তম প্রতিদান কার জন্য?

দ্বিতীয় আয়াতের শেষাংশ খুব সরাসরি:
أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا حَسَنًا
অর্থ: নিশ্চয়ই তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।
এখানে لَهُمْ অর্থ তাদের জন্য এবং أَجْرًا حَسَنًا অর্থ উত্তম প্রতিদান।

কাদের জন্য এই প্রতিদান?

আয়াতের আগের অংশ তার উত্তর দিয়েছে। তারা হলো:
الْمُؤْمِنِينَ
যারা ঈমান আনে।

আর শুধু এটুকুই নয়। তাদের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে:
الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ
যারা সৎকর্ম করে।
অতএব সূরা আল কাহফের দ্বিতীয় আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে ঈমানদার সৎকর্মশীলদের।

প্রথম দুই আয়াতের একটি গভীর বার্তা

সূরা আল কাহফের প্রথম দুই আয়াতকে পাশাপাশি রাখলে কোরআনের নিজের দেওয়া পরিচয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু হয়েছে বক্তব্য।
তারপর এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব নাজিলের ঘোষণা।
এরপর এসেছে কিতাবের বক্রতাহীনতার কথা।
তারপর বলা হয়েছে এটি সোজা ও সুপ্রতিষ্ঠিত।

এরপর এসেছে সতর্কবার্তা।

সঙ্গে এসেছে সুসংবাদ।
আর সেই সুসংবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঈমান ও সৎকর্ম।
সবশেষে এসেছে উত্তম প্রতিদানের ঘোষণা।
অর্থাৎ মাত্র দুই আয়াতের মধ্যেই কোরআনের উৎস, বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের প্রতি এর বার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
কোরআনের প্রথম দুই আয়াত আমাদের কী জানায়?
শুধু এই দুই আয়াতের বক্তব্যকে সামনে রাখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

প্রথমত: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন।

তৃতীয়ত: সেই কিতাবে কোনো বক্রতা নেই।

চতুর্থত: কিতাবটি সোজা ও সুপ্রতিষ্ঠিত।

পঞ্চমত: এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়।

ষষ্ঠত: মুমিনদের সুসংবাদ দেওয়া হয়।

সপ্তমত: সেই মুমিনদের কথা বলা হয়েছে যারা সৎকর্ম করে।

অষ্টমত: তাদের জন্য উত্তম প্রতিদানের ঘোষণা রয়েছে।

কোরআনের নিজের পরিচয় কোরআনের ভাষাতেই

কোনো বাহ্যিক ব্যাখ্যা ছাড়াই যখন সূরা আল কাহফের প্রথম দুই আয়াত পড়া হয়, তখন কোরআন সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট পরিচয় সামনে আসে।

এটি আল্লাহর নাজিল করা কিতাব।
এতে কোনো বক্রতা নেই।
এটি সোজা ও সুপ্রতিষ্ঠিত।
এর মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করা হয়।
এর মাধ্যমে ঈমানদার সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দেওয়া হয়।
এবং তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদানের ঘোষণা।

এখানেই এই দুই আয়াতের মূল বক্তব্যের সৌন্দর্য। কোরআন নিজেই নিজের উৎসের কথা বলেছে, নিজের বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছে এবং মানুষের জন্য তার বার্তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে, সতর্কতা ও সুসংবাদ।

পরিশেষে
সূরা আল কাহফের প্রথম দুই আয়াত কোরআনের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী পরিচয় তুলে ধরে। প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা, এরপর তাঁর পক্ষ থেকে কিতাব নাজিলের ঘোষণা। তারপর সেই কিতাবের বক্রতাহীনতার কথা এবং তার সোজা ও সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা।

এরপর মানুষের জন্য কোরআনের উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে। কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করা এবং ঈমানদার সৎকর্মশীলদের উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ দেওয়া।

এই দুই আয়াতের আলোকে কোরআনকে বুঝতে গেলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: কোরআন শুধু পাঠ করার জন্য একটি কিতাব হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেনি। বরং এর আয়াতের মধ্যেই সতর্কবার্তা রয়েছে, সুসংবাদ রয়েছে এবং মানুষের সামনে ঈমান ও সৎকর্মের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সূরা আল কাহফের শুরুতেই তাই কোরআন মানুষকে তার উৎস, বৈশিষ্ট্য এবং উদ্দেশ্যের দিকে দৃষ্টি দিতে আহ্বান জানায়।

সূরা আল কাহফ, আয়াত ১ ও ২।

 

আরও