চড়া সবজির বাজারঃ ক্রেতা ও কৃষক দুই পক্ষই চাপে
ঢাকার মান্ডা-মুগদা, কারওয়ান বাজার কিংবা মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট গত এক সপ্তাহে সবজির বাজারে গেলে একই চিত্র। ক্রেতার ব্যাগ ভরছে না, বিক্রেতার মুখে চিন্তা।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাঁচা সবজির বাজারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রভাবটা দুই জায়গায় পড়েছে পরিবহন খরচ ও মোকামে দাম।
বাজারের বর্তমান চিত্র
গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
– শিম: ১৬০-১৭০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২০০ টাকা কেজি। সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
– টমেটো: ৮০-৯০ টাকা থেকে ১০০ টাকা
– বেগুন: ৮০ থেকে ১০০ টাকা
– পটল: ৫০ থেকে ৭০ টাকা
– বরবটি: ৬০ থেকে ৮০ টাকা
– করলা, ঝিঙা, ধুন্দল: ৬০ থেকে ৭০ টাকা
– শসা, মুলা: ৫০ থেকে ৬০ টাকা
– লাউ: ৭০-৮০ টাকা পিস, চালকুমড়া ৬০ টাকা পিস
ব্যবসায়ী ফজলুল মিয়া বলেন, “এক ট্রাক সবজি যশোর থেকে ঢাকায় আনতে আগে ভাড়া লাগত ১৮ হাজার, এখন ২২-২৩ হাজার লাগছে। এই খরচটা ভাগ হয়ে কেজিতে পড়ে।”
আসল সমস্যা কোথায়? ১০০ ফুটে ৩০ টাকার ফারাক
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি। আরামবাগের কামারপুকুর বাজারে দেখা গেছে, চাষি পাইকারিতে পটল বিক্রি করছেন ৩০-৪০ টাকা কেজি, মাত্র ১০০ ফুট দূরের খুচরা বাজারে সেই পটলই ৬০-৭০ টাকা। শসা পাইকারি ৬০ টাকা, খুচরা ১০০ টাকা।
অর্থাৎ জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে সত্য, কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী পর্যায়ে।
একজন ক্রেতা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “জ্বালানি ২০ টাকা বাড়লে কেজিতে ২-৩ টাকা বাড়তে পারে, ২০ টাকা কেন বাড়বে?”
কৃষক কী পাচ্ছে?
মাঠ পর্যায়ে কৃষক কিন্তু লাভবান হচ্ছেন না। বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে এবার সবজির বীজতলা নষ্ট হয়েছে, ফলন কমেছে। আবার সারের দাম ও সেচের খরচ বেড়েছে। কৃষক ৩০ টাকায় বিক্রি করলে ঢাকায় তা ৭০ টাকা হচ্ছে মাঝের ৪০ টাকা কৃষক পাচ্ছেন না।
সমাধানের পথ কী? – আতঙ্ক নয়, পরিকল্পনা প্রয়োজন
এই পরিস্থিতি স্থায়ী নয়। প্রতি বছর আশ্বিন মাসে আগাম শীতের সবজির দাম একটু বেশি থাকে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আর ৩-৪ সপ্তাহ পর শীতের পুরোদমে সবজি উঠলে দাম কমে আসবে। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
১. পরিবহনে অস্থায়ী সহায়তা: সবজিবাহী ট্রাকের জন্য নির্ধারিত রুটে টোল বা চাঁদা নজরদারি করা, যাতে বাড়তি ভাড়ার অজুহাতে দাম না বাড়ে।
২. সরাসরি বিপণন: প্রতি জেলা শহরে সপ্তাহে ২ দিন কৃষকের বাজার (Farmers Market) চালু করা, যেখানে কৃষক সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারবেন। এতে ২০-৩০ টাকার ফারাক কমবে।
৩. তথ্য প্রবাহ: কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিদিন পাইকারি ও খুচরা দামের তালিকা অনলাইনে ও বাজারে টানিয়ে দিলে ক্রেতা ঠকবেন না।
৪. সংরক্ষণ: কোল্ড স্টোরেজ ও ছোট হিমাগার ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ালে বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে সবজি নষ্ট হবে না।
শেষ কথা
সবজির দাম বাড়া মানে শুধু দামের সংখ্যা নয়, এর সাথে জড়িত নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি। একজন রিকশাচালক যদি ২০০ টাকা কেজি শিম কিনতে না পারেন, তিনি পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হবেন।
তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন গুজব না ছড়িয়ে বাজার মনিটরিং জোরদার করা এবং কৃষক যেন তার ন্যায্য দাম পান তা নিশ্চিত করা। জ্বালানির দাম বৈশ্বিক কারণে সমন্বয় করা হয়েছে এটি সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও ভর্তুকির চাপে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই চাপ যেন সাধারণ মানুষের প্লেটে না পড়ে, তার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ।
বাংলাদেশের কৃষক সবসময় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সঠিক সহায়তা পেলে এই অস্থায়ী চড়া বাজারও দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।