মূর্খতার সঙ্গে বিতর্ক নয়: কোরআনের নির্দেশনায় জ্ঞানীর সংযম ও প্রজ্ঞা
অনুমাননির্ভর কথাবার্তা ও অনর্থক বিতর্ক থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দিয়েছে কোরআন
মানুষের জ্ঞান, চিন্তা ও উপলব্ধির মধ্যে পার্থক্য থাকবেই। কেউ তথ্য, প্রমাণ ও সত্যের ভিত্তিতে কথা বলে; আবার কেউ পর্যাপ্ত জ্ঞান বা প্রমাণ ছাড়াই অনুমাননির্ভর বক্তব্য উপস্থাপন করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন জ্ঞানী মানুষের করণীয় কী কোরআন এ বিষয়ে অত্যন্ত সংযত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পথনির্দেশ দিয়েছে।
কোরআনের ভাষায়, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা অহেতুক বিতর্কে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন না। কেউ যখন অজ্ঞতাপূর্ণ বা মূর্খতাসুলভ কথা নিয়ে তাদের মুখোমুখি হয়, তখন তারা উত্তেজনায় পাল্টা বিতর্কে না গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সরে যাওয়ার পথ বেছে নেন।
আল্লাহ বলেন,
«“আর রহমানের বান্দারা তারা, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম।’”
—সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩»
এখানে “الجاهلون” (আল-জাহিলূন) শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন অজ্ঞতার মোকাবিলায় অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণকে উৎসাহিত করেনি। বরং আল্লাহর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ও অনর্থক সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মূর্খতার সঙ্গে তর্কে না জড়ানোর কোরআনিক শিক্ষা
আরেক স্থানে আল্লাহ আরও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন,
“ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদের থেকে বিমুখ হও।”
—সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১৯৯
এই আয়াতের শেষাংশ “অজ্ঞদের থেকে বিমুখ হও” (وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ) মানুষের আচরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে। সব বক্তব্যের জবাব দেওয়া জরুরি নয়, সব বিতর্কে অংশ নেওয়াও প্রজ্ঞার পরিচয় নয়। কোনো আলোচনা যদি সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে অহেতুক বাকবিতণ্ডায় পরিণত হয়, তাহলে সেখান থেকে সরে আসাই কোরআনের নির্দেশিত সংযমের পথ।
অনুমান নয়, জ্ঞানের ভিত্তিতে কথা বলা
কোরআন অনুমাননির্ভর বক্তব্যের ব্যাপারেও সতর্ক করেছে। আল্লাহ বলেন,
“তোমরা যে বিষয়ে জ্ঞান রাখো না, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
—সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬»
অর্থাৎ কোনো বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে সেটিকে সত্য হিসেবে প্রচার করা কোরআনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। মানুষের শ্রবণ, দৃষ্টি ও অন্তর সবকিছুরই জবাবদিহি রয়েছে।
আরও বলা হয়েছে,
“তারা তো কেবল অনুমানের অনুসরণ করে, অথচ সত্যের বিপরীতে অনুমান কোনো কাজে আসে না।”
—সূরা আন-নাজম, ৫৩:২৮
তাই কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে কোরআনের শিক্ষা হলো জ্ঞান ও সত্যের ভিত্তিতে কথা বলা; নিছক ধারণা, অনুমান কিংবা অজ্ঞতার ওপর বক্তব্য দাঁড় করানো নয়।
জ্ঞানীর শক্তি কখনো কখনো নীরবতা
অনেক সময় মানুষ মনে করে, কোনো বক্তব্যের জবাব না দিলে বুঝি নিজের অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু কোরআনের শিক্ষা ভিন্ন। সত্য প্রতিষ্ঠার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি উসকানিমূলক বক্তব্যের উত্তর দিতে হবে।
আল্লাহর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে কোরআন দেখায় অজ্ঞ ব্যক্তির মুখোমুখি হলে তারা শান্তিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখে। আবার অজ্ঞদের থেকে বিমুখ হওয়ার নির্দেশও এসেছে।
এখানে বিমুখ হওয়া মানে সত্য থেকে পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং এমন অনর্থক পরিস্থিতি থেকে সরে যাওয়া, যেখানে যুক্তি ও সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে বিতর্ক, উত্তেজনা কিংবা অজ্ঞতাপূর্ণ বাক্যবিনিময় প্রাধান্য পায়।
সত্যের আলোচনা আর অহেতুক বিতর্ক এক নয়
কোরআন জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা নিষিদ্ধ করেনি। বরং আল্লাহ বলেন,
“তোমার রবের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়।”
—সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫»
অতএব কোরআনের দৃষ্টিতে পার্থক্যটি স্পষ্ট। সত্য অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে প্রজ্ঞা ও উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা এক বিষয়; আর অহেতুক বিতর্ক, অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য ও বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
একজন জ্ঞানী মানুষ তাই শুধু কী বলবেন তা নয়, কখন বলবেন এবং কখন নীরব থাকবেন সেটিও বিবেচনা করেন।
কোরআনের আলোকে জ্ঞানীর করণীয়
কোরআনের এসব আয়াত একত্রে বিবেচনা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সামনে আসে
প্রথমত, যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে কথা বা অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অনুমানকে সত্যের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
তৃতীয়ত, অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণের জবাবে একই ধরনের আচরণ করা যাবে না।
চতুর্থত, অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণভাবে সরে যাওয়া প্রজ্ঞার পরিচয় হতে পারে।
পঞ্চমত, সত্যের আলোচনা করতে হলে তা হতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সর্বোত্তম পদ্ধতির মাধ্যমে।
শেষ কথাঃ
মূর্খতার সঙ্গে বিতর্কে জয়ী হওয়ার চেয়ে নিজের চরিত্র, সংযম ও সত্যনিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন মানুষকে প্রতিটি কথার প্রতিক্রিয়া দিতে শেখায় না; বরং কোথায় কথা বলতে হবে এবং কোথায় অজ্ঞতার সংঘাত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে সেই প্রজ্ঞাও শিক্ষা দেয়।
তাই কোরআনের আলোকে বলা যায়, অজ্ঞতার জবাব অজ্ঞতা দিয়ে নয়, বরং জ্ঞান, সংযম ও প্রজ্ঞা দিয়ে দিতে হয়। আর যখন কোনো আলোচনা সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে অর্থহীন বিতর্কে পরিণত হয়, তখন শান্তিপূর্ণভাবে সরে যাওয়াই হতে পারে একজন মুমিনের উত্তম পথ।
“যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে ‘সালাম।’”
—সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩
আর আল্লাহর নির্দেশ—
“অজ্ঞদের থেকে বিমুখ হও।”
—সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১৯৯