চায়না শক ২.০: প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত নাকি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভূমিকম্প?
উন্নয়নশীল দেশগুলো যেমন বাংলাদেশের জন্য এই অর্থনৈতিক ধাক্কা কী সংকেত বহন করছে?
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? আগের চেয়ে ভিন্ন মাত্রায়, ইতিহাস কখনো হুবহু নিজের পুনরাবৃত্তি করে না তবে কখনো কখনো হাঁটে ভীতিকর মিল রেখে।
১৯৯০-এর দশকে চীন যখন বিশ্বের উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে ওঠার পথে হাঁটছিল, পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের অনেকেই তখন বুঝতে পারেননি এই পরিবর্তন একদিন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘ভূমিকম্প’ এনে দেবে। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) চীনের যোগদানের পর যে ধাক্কা লাগে, তা ‘চায়না শক’ নামে চিহ্নিত করেন এমআইটির অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটো।
সেই ‘শক’ এর রেশ তখনো পুরোপুরি কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাত থেকে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছিলেন। শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর দাম দিয়েছিল পুরো সমাজ শিল্পনগরীতে বেড়েছিল বেকারত্ব, পরিবার ভাঙন, এমনকি আত্মহত্যা ও মাদকাসক্তির হার।
এখন যেন সেই ইতিহাসই ফিরছে তবে আরও ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞরা যাকে বলছেন—চায়না শক ২.০।
কেবল সস্তা পণ্য নয়, এবার হাই-টেক অস্ত্র
প্রথম চায়না শকে চীনের প্রধান শক্তি ছিল সস্তা শ্রম। কিন্তু ২০২৬-৩০ সালের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় চীন যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলে।
লক্ষ্য এবার—
· রোবোটিক্স,
· কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI),
· কোয়ান্টাম প্রযুক্তি,
· বায়োটেকনোলজি এবং
· নবায়নযোগ্য জ্বালানি।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন: উন্নত প্রযুক্তির পণ্যও এবার চীন দিচ্ছে কম দামে। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার প্রযুক্তিগত ‘ঢাল’ এখন কার্যকর নয়।
জার্মানি ইতিমধ্যেই চাপ অনুভব করছে। বেলজিয়ামভিত্তিক গবেষণা সংস্থা Centre for European Reform-এর তথ্য বলছে
মাত্র এক বছরে জার্মানির সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে ১২ বিলিয়ন থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। মোট বাণিজ্য ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৯৪ বিলিয়ন ডলার।
জার্মানির মতো শিল্পশক্তির অবস্থা যেখানে এই, সেখানে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবলেই শিউরে ওঠার কথা।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গঃ দশ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘চায়না শক ২.০’ মোটেই দূরবর্তী কোনো শঙ্কা নয়।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী
· দেশের ইলেকট্রনিক্স খাতে রয়েছে ৩ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান।
· এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষের।
· মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার এসব পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
কিন্তু বাজারের বাস্তবতা কঠিন। চীনা পণ্য ইতিমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে।
এখন চীনের নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তিপণ্য ঢুকতে শুরু করলে পড়তে হবে টিকে থাকার কঠিন যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে হার মানলে মূল্য চোকাবেন সেই ১০ লাখ মানুষ।
দুই পক্ষের যুক্তিঃ ভোক্তা বনাম শ্রমিক
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম পিপলস ডেইলি ও গ্লোবাল টাইমস বলছে
“চীনের সাশ্রয়ী ও উন্নত প্রযুক্তিপণ্য আসলে সাধারণ মানুষের জন্য প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করছে।”
যুক্তিটি পুরোপুরি ভুল নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই ভোক্তারা কম দামে উন্নত প্রযুক্তি পাচ্ছেন। কিন্তু এই সুবিধার একটি অদৃশ্য মূল্যও আছে।
যখন স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হয়, কর্মসংস্থান কমে, পরিবারের আয় কমে যায় তখন সস্তা পণ্যের ‘আনন্দ’ মলিন হয়ে পড়ে। ভোক্তার স্বার্থ আর শ্রমিকের স্বার্থ এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নীতিনির্ধারকদের দুটো দিকই বিবেচনা না করলে নীতি অসম্পূর্ণ থাকে।
করণীয়: নিষ্ক্রিয়তা নয়, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ
প্রশ্ন হলো এখন করণীয় কী?
· আমদানি নিষিদ্ধ করা বা শুল্কবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
· নিষ্ক্রিয় বসে থাকা মানে ধ্বংস ডেকে আনা।
টেকসই সমাধান বরং হচ্ছেঃ
✅ দেশীয় শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো
✅ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা
✅ উদ্ভাবনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়া
গ্লোবাল টাইমস-এর ভাষ্যমতে
“যারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ কাজে লাগায়, তারাই টিকে থাকে।”
এই বাণী চীনের জন্য যেমন সত্য, বাংলাদেশের জন্যও তেমনি।
সুযোগে রূপান্তরের সময়
ইতিহাস বলে প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা কিছু দেশকে পিছিয়ে দেয়, আবার কিছু দেশ সেই ধাক্কাকেই সুযোগে রূপান্তরিত করে।
প্রথম চায়না শকের সময় দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান নিজেদের প্রযুক্তি খাতকে মজবুত করেছিল। সেই পথেই এখন হাঁটতে হবে বাংলাদেশকেও।
‘চায়না শক ২.০’ এখন আর শুধু থিংক ট্যাঙ্কের সতর্কবার্তা নয় এটি সময়ের বাস্তবতা।
প্রশ্ন শুধু একটাই আমরা কি সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত?
তথ্যসূত্র: MIT, Centre for European Reform, BIDA, Global Times, People’s Daily