×
×
Sunday, 26 July, 2026, 11:19 am


উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও ঋণের চাপ: বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ উন্নয়ন তহবিল জোগাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও দেশের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় বড় মেগা প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে বৈদেশিক ঋণের চাপ একটি জটিল অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান ঋণের চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের ঋণ রয়েছে। প্রধান ঋণদাতারা হলো: বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা (জাপান), চীন, রাশিয়া ও ভারত।

ঋণের চাপ বৃদ্ধির কারণসমূহ

১. মেগা প্রকল্প: পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো বিপুল অর্থের প্রকল্প ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে।

২. ডলার সংকট: গত দুই বছরে রিজার্ভ হ্রাস পাওয়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপ বেড়েছে।

৩. স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কমে যাওয়া: বাণিজ্যিক ঋণের হার ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের অনুপাত বাড়ায় পরিশোধ চাপ বেশি।

৪. রফতানি আয়ে স্থবিরতা: প্রত্যাশিত হারে রফতানি আয় না বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় কমেছে।

ঝুঁকির মাত্রা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনও ‘স্বল্প-ঝুঁকি’তে অবস্থান করছে। ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৫-১৭% এর মধ্যে (যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম)। কিন্তু ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা (ডিএসআর) বাড়ছে বর্তমানে রপ্তানি আয়ের ৮-১০% চলে যায় শুধু ঋণ পরিশোধে।

উদ্বেগের বিষয়

· উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের অভাব: অনেক ঋণ উৎপাদনশীল খাতের বদলে ভোক্তা বা স্থায়ী সম্পদে গেছে।

· স্বল্প সুদী দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কমে যাওয়া: আগের তুলনায় কঠিন শর্তে ঋণ নিতে হচ্ছে।

· ভূরাজনৈতিক প্রভাব: চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অধীন ঋণ কিছু ক্ষেত্রে কঠিন শর্তে দেয়া হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

সুপারিশ

১. রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তি মজবুত করা

২. অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো

৩. নতুন ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে কম সুদ ও দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড নিশ্চিত করা

৪. বিদ্যমান ঋণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো

৫. ঋণের অর্থ শুধু উৎপাদনশীল ও আয়-উপযোগী খাতে ব্যয় করা

বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের চাপে এখনই বিপর্যয়ের মুখে নেই, তবে সতর্ক না হলে আগামীতে চাপ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও আয় বাড়ানোর কৌশলের মাধ্যমে এই চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব। ঋণ যেমন উন্নয়নের অগ্রদূত, তেমনি দায়িত্বহীন ঋণগ্রহণ দেশকে দেউলিয়া অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আরও