হৃদয়ের মোহর ও আধ্যাত্মিক অন্ধত্বঃ কুরআনের দৃষ্টিতে কি
মানবজীবনের মূল চালিকা শক্তি হলো তার অন্তর (ক্বলব), শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তি। পবিত্র কুরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে মানুষ যদি সত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং ধারাবাহিকভাবে অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকে, তবে তার এই ক্ষমতাগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সূরা আল-বাকারাহ (২:৭)-এ আল্লাহ বলেন:
> “আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের চোখসমূহে রয়েছে পর্দা; আর তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।”
এই আয়াত মানুষের আধ্যাত্মিক পতনের একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে।
১. ‘মোহর লাগানো’—এর তাৎপর্য
এখানে “মোহর” (خَتَمَ) দ্বারা বোঝানো হয়েছে সত্য গ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এটি আকস্মিক নয়; বরং মানুষের নিজস্ব কর্মফলের ফলশ্রুতি।
কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছেঃ
সূরা আন-নাহল (১৬:১০৮)
“এরা সেই লোক, যাদের অন্তর, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির উপর আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন…”
সূরা মুহাম্মদ (৪৭:২৪)
“তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা করে না, নাকি তাদের অন্তরগুলো তালাবদ্ধ?”
এখানে স্পষ্ট হয় মোহর লাগানো মানে চিন্তা-ভাবনা ও সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
২. কেন এই মোহর আরোপ করা হয়
আল্লাহ কাউকে বিনা কারণে পথভ্রষ্ট করেন না। বরং মানুষের নিজস্ব অস্বীকার, অহংকার ও পাপাচারই তাকে এই অবস্থায় নিয়ে যায়।
সূরা আস-সাফ (৬১:৫)
“তারা যখন পথভ্রষ্ট হলো, আল্লাহ তাদের অন্তরকে পথভ্রষ্ট করে দিলেন।”
সূরা আত-তাওবা (৯:১২৫)
“তাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, আর আল্লাহ তাদের রোগ আরও বাড়িয়ে দেন…”
অতএব, এটি শাস্তিমূলক একটি প্রতিক্রিয়া মানুষের অবিরাম অবাধ্যতার ফল।
৩. শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির পর্দাঃ
আয়াতে বলা হয়েছে তাদের কানে ও চোখে পর্দা রয়েছে। অর্থাৎ, তারা সত্য শুনলেও গ্রহণ করে না, দেখলেও উপলব্ধি করে না।
সূরা আল-আ’রাফ (৭:১৭৯)
“তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা বোঝে না; তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না; তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না।”
এটি শারীরিক অক্ষমতা নয়, বরং আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব।
৪. পরিণতিঃ মহা শাস্তি
এই অবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি হলো কঠিন শাস্তি।
সূরা আল-জাসিয়া (৪৫:২৩)
“আল্লাহ তার জ্ঞান অনুযায়ী তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তার শ্রবণ ও অন্তরে মোহর দিয়েছেন…”
এতে বোঝা যায় যে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছাকে সত্যের উপর প্রাধান্য দেয়, সে শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে যায়।
৫. শিক্ষাঃ
এই আয়াত থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়:
1. সত্য অস্বীকারের পরিণতি ভয়াবহ এটি অন্তরকে স্থায়ীভাবে অন্ধ করে দিতে পারে।
2. মানবের স্বাধীন ইচ্ছার গুরুত্ব রয়েছে পথভ্রষ্টতা শুরু হয় মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত থেকে।
3. কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা জরুরি অন্যথায় অন্তর তালাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
4. আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য পাপ ও অহংকার মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
সূরা আল-বাকারাহ (২:৭) আয়াতটি আমাদের সতর্ক করে দেয় মানুষ যদি বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তবে একসময় তার অন্তর, কান ও চোখ এমনভাবে বন্ধ হয়ে যায় যে, সে আর সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না। তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজেকে পর্যালোচনা করা, কুরআনের আলোকে জীবন পরিচালনা করা এবং আল্লাহর নিকট হিদায়াত কামনা করা।