নবী ইউসুফ (সা.)-এর ঐতিহাসিক সেই দোয়া, যা তিনি তার জীবনের এক বিশেষ মহূর্তে করেছেন
সূরা ইউসুফের ১০১ নং আয়াতটি নবী ইউসুফ (আ.)-এর একটি ঐতিহাসিক দোয়ার বিবরণ দিয়েছে, যা তিনি তার জীবনের এক বিশেষ পর্বে করেছেন। তার পিতার সাথে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পুনর্মিলন, মিশরের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং ভাইদের ক্ষমা করার পর, যখন তার ওপর আল্লাহর সমস্ত নেয়ামত পূর্ণতা পায়, তখন তিনি একটি বিনীত প্রার্থনায় আল্লাহর দিকে ফিরে যান। তিনি পৃথিবীর কোনো স্বার্থান্বেষী শাসকের মতো নিজের সাফল্য নিয়ে আত্মপ্রসাদে মেতে না উঠে বরং দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং অনন্ত জীবনের প্রকৃত সফলতা কামনা করেন।
رَبِّ قَدْ اٰتَيْتَنِيْ مِنَ الْمُلْكِ وَ عَلَّمْتَنِيْ مِنْ تَاْوِيْلِ الْاَحَادِيْثِۚ فَاطِرَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِۚ اَنْتَ وَلِيّٖ فِى الدُّنْيَا وَ الْاٰخِرَةِۚ تَوَفَّنِيْ مُسْلِمًا وَّ اَلْحِقْنِيْ بِالصّٰلِحِيْنَ (সূরা ইউসুফ, ১২:১০১)
উচ্চারণঃ
“রাব্বি কাদ আ-তাইতানী মিনাল মুলকি ওয়া ‘আল্লামতানী মিন তা’বীলিল আহা-দীছি। ফা-তিরাছ ছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি। আন্তা ওয়ালিইয়ী ফিদ দুনইয়া-ওয়াল আখিরাহ্। তাওয়াফফানী মুছলিমাওঁ ওয়া আলহিকনী বিস্ সা-লিহীন।”
বাংলা অনুবাদঃ
“হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন এবং আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন। হে আসমান ও যমীনের স্রষ্টা! আপনিই দুনিয়া ও আখেরাতে আমার কার্যনির্বাহী। আমাকে পূর্ণ আনুগত্যশীল অবস্থায় দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিন এবং আমাকে পরিপূর্ণ সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত রাখুন।”
শব্দার্থ বিশ্লেষণঃ
আয়াতটির গভীর অর্থ উপলব্ধির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
مِنَ الْمُلْكِ (মিনাল মূলকি) রাজত্বের অংশবিশেষ নবী ইউসুফ (আ.) আল্লাহর দেয়া রাজত্বকে পুরোপুরি নিজের বলে দাবি না করে বিনয়ের সাথে “কিছু রাজত্ব” উল্লেখ করেছেন, যা তার নম্রতার প্রমাণ। এটি মিশরের সার্বভৌম ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।
مِنْ تَاْوِيْلِ الْاَحَادِيْثِ (মিন তা’বীলিল আহাদীছ) স্বপ্নের ব্যাখ্যার কিছু জ্ঞান এখানে উল্লেখিত জ্ঞান শুধু স্বপ্নের ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ঘটনার গভীর রহস্য উদঘাটনের ক্ষমতা, যা নবী ইউসুফ (আ.)-এর অন্যতম প্রধান গুণ।
فَاطِرَ (ফাতির) সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক আসমান ও যমীনকে “ফাতির” শব্দ দ্বারা সম্বোধন করে তিনি আল্লাহকে অনন্য ও অতুলনীয় সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করেছেন, যিনি কোনো পূর্ব নমুনা ছাড়াই এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।
وَلِيّٖ (ওয়ালি) অভিভাবক, বন্ধু, রক্ষাকর্তা ইহকাল ও পরকালে একমাত্র আল্লাহই তার অভিভাবক ও সাহায্যকারী। এটি বিশ্বাসের গভীর দৃঢ়তা প্রকাশ করে যে দুনিয়ার ক্ষমতা ও মর্যাদা ক্ষণস্থায়ী, প্রকৃত রক্ষাকর্তা একমাত্র আল্লাহ।
تَوَفَّنِيْ مُسْلِمًا (তাওয়াফফানী মুসলিমা) আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দাও মুসলিম অর্থ আত্মসমর্পণকারী। নবী ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে সর্বশেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তার প্রতি আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের অবস্থা বহাল রাখার প্রার্থনা করেছেন। এটি “হুসনুল খাতিমাহ” বা সুন্দর পরিণতির প্রার্থনা।
بِالصّٰلِحِيْنَ (বিস সালেহীন) সৎকর্মশীলদের সাথে এখানে বিশেষ করে নবী-রাসূল ও সত্যের অনুসারীদের সাথে থাকার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, যাতে আখিরাতে তাদের সঙ্গ লাভ করা যায়।
সূরা ইউসুফের ১০১ নং আয়াতটি একটি অনন্য উদাহরণ যেখানে নবী ইউসুফ (আ.) তার জীবনের মহাসাফল্যের পর আল্লাহর দিকে ফিরে কৃতজ্ঞতা ও আত্মসমর্পণের দোয়া পেশ করেছেন। এই দোয়াটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শনের প্রতিফলন, যা আমাদের শেখায়:
(ক) সাফল্যের মুহূর্তে কৃতজ্ঞতা ও নম্রতা বজায় রাখা,
(খ) দুনিয়ার সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত হিসেবে দেখা,
(গ) আখিরাতে সুন্দর পরিণতি ও উত্তম সঙ্গ লাভের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা, এবং
(ঘ) শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইমানের ওপর অটল থাকার প্রার্থনা করা।
এই দোয়াটি শুধু একজন নবীর ব্যক্তিগত প্রার্থনা ছিল না, বরং এটি প্রতিটি মুসলিমের জন্য একটি অনুসরণীয় আদর্শ। নবী ইউসুফ (আ.)-এর এই দোয়াটি যেন আমাদের জন্যও একটি পথনির্দেশ হয়ে থাকে, যাতে আমরা দুনিয়ার সমৃদ্ধিতে বিভোর না হয়ে প্রকৃত সফলতার দিকে ধাবিত হতে পারি।