×
×
Sunday, 13 September, 2026, 9:40 pm


আখেরাতে সৎকর্ম গ্রহণের শর্ত: ঈমানের অনিবার্যতা

পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা হলো, আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনে সাফল্য লাভের জন্য শুধু সৎকর্ম যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহর কাছে সেই ‘সৎকর্ম’ গ্রহণের পূর্বশর্ত হলো ঈমান। ঈমান ছাড়া যাবতীয় সৎকর্ম দুনিয়াতেই বিনষ্ট হয়ে যায় এবং আখেরাতে তার কোনো মূল্য নেই। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে ‘কর্ম গ্রহণের শর্ত হিসেবে ঈমানের আবশ্যকতা’ তুলে ধরা হলো।

১. ঈমান ও সৎকর্মের সমন্বয়: সাফল্যের চাবিকাঠি

পবিত্র কোরআনের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ তাআলা ‘ঈমানদার ও সৎকর্মশীল’ বান্দাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:

“নিশ্চয় যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আমরা তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবো, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৭)

উপরিউক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায়, কেবল ঈমান যথেষ্ট নয়, আবার কেবল সৎকর্মও যথেষ্ট নয়; বরং ঈমান ও সৎকর্মের সমন্বয় ইসলামের দৃষ্টিতে কাম্য। এটি দুটি স্তম্ভের মতো: ঈমান হলো ভিত্তি, আর সৎকর্ম হলো এর উপর নির্মিত অট্টালিকা। ভিত্তি ছাড়া অট্টালিকা যেমন টেকসই হয় না, তেমনি ঈমান ছাড়া সৎকর্ম আখেরাতে গ্রহণযোগ্য হয় না।

২. কেন ঈমান ছাড়া সৎকর্ম ‘বিনষ্ট’ হয়ে যায়?

পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে:

“যারা তাদের রবের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদের কর্মসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে; সুতরাং কিয়ামতের দিন আমরা তাদের জন্য কোনো গুরুত্ব স্থির করব না।” (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ১০৫)

অর্থাৎ, যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে (পুনরুত্থান ও হিসাব, নিকাশে) বিশ্বাস করে না (অর্থাৎ ঈমান আনে না), তাদের দান, খয়রাত, সলাত, সিয়াম যাই হোক না কেন, তা আল্লাহর দৃষ্টিতে নিষ্ফল।

৩. মুনাফিকদের উদাহরণ: বাহ্যিক চাকচিক্য, বাস্তব শূন্যতা

পবিত্র কোরআনের ৬৩ নম্বর সূরা ‘আল-মুনাফিকুন’-এ মুনাফিকদের অবস্থা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন:

“যখন তুমি তাদেরকে দেখ, তখন তাদের দেহাবয়ব তোমাকে চমৎকৃত করে; আর যখন তারা কথা বলে, তখন তোমরা তাদের কথা শোন। তারা যেন দেয়ালে ঠেকানো কাঠের টুকরা…” (সূরা আল-মুনাফিকুন, আয়াত: ৪)

গোটা সূরাটি মুনাফিকদের চরিত্র বিশ্লেষণ করে। তাদের মধ্যে সৎকর্মের বাহ্যিক আভাস ছিল, কিন্তু অন্তরে ছিল কুফরি ও দ্বিধা। তাই আল্লাহ তাদের দান-খয়রাতও কবুল করেননি। মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ায় অলসভাবে এবং খরচ করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও,
আর আল্লাহ বলেন: “তোমরা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ব্যয় করো, তা তোমাদের থেকে কখনো গ্রহণ করা হবে না। নিশ্চয়ই তোমরা পাপী সম্প্রদায়।” (সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৫৩-৫৪)।
তাই ‘আমল কবুলের জন্য আমলকারীর নেককার (মুত্তাকী) হওয়া জরুরি’ । ঈমান না থাকলে আমলকারীর নেককার হওয়া সম্ভব নয়, তাই তার আমল পাল্লায় ওজনহীন থাকে।

৪. দুনিয়াবি স্বার্থে সৎকর্ম: লোক দেখানো ও ধোঁকা

ঈমানের অভাবে যেমন আমল নষ্ট হয়, তেমনি ‘রিয়া’ বা লোক দেখানোর জন্যও আমল বিনষ্ট হয় এবং তা কার্যকরীভাবে শিরকের সমতুল্য। যারা কেবল দুনিয়ার স্বার্থে বা প্রশংসা লাভের জন্য সৎকর্ম করে, তাদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

“যারা পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কর্মের পুরোপুরি ফল এখানেই দিয়ে দেব এবং তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। তারাই সেই ব্যক্তি, যাদের জন্য আখেরাতে কেবল জাহান্নাম রয়েছে; আর এখানে তারা যা করেছে তা নিষ্ফল এবং তাদের কৃতকর্ম ব্যর্থ।” (সূরা হুদ, আয়াত: ১৫-১৬)

অর্থাৎ, কেউ যদি সলাত পড়ে দুনিয়ার খ্যাতির জন্য, বা দান করে ‘বড় লোক’ বলতে চায়, আল্লাহ তাকে দুনিয়াতেই তার প্রাপ্য দিয়ে দেন (সম্মান, খ্যাতি, টাকা)। ফলে আখেরাতে তার জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, আখেরাতে নাজাতের জন্য সৎকর্ম যেমন আবশ্যক, তেমনি তার চেয়েও বেশি আবশ্যক হলো সঠিক ঈমান। ঈমান হলো সেই চাবিকাঠি, যা ছাড়া সৎকর্মের ভান্ডার খোলাই যায় না। কোরআনের ভাষায় যা সুন্দর দেখায়, যদি তা আল্লাহর জন্য না হয় এবং তার নির্দেশিত পদ্ধতিতে না হয়, তবে তা ধুলিসমান। তাই মুমিন ব্যক্তি সর্বদা নিজের নিয়ত সংশোধন করে এবং ঈমানের পরিধির ভিতর থেকে সৎকর্ম করে যান যাতে তা আখেরাতে তার জন্য চিরস্থায়ী পুরস্কার বয়ে আনে।

আরও