জ্ঞান—মহামূল্যবান কল্যাণের চাবিকাঠি
পবিত্র কোরআন মানবজাতির জন্য জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে বহু স্থানে অসামান্য ভাবে তুলে ধরেছে। জ্ঞানকে কেবল তথ্য বা শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে, আল্লাহ তা’আলা একে “প্রভূত কল্যাণ” বা বিরাট সৌভাগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই প্রতিবেদনে আলোচিত হবে সূরা আল-বাকারার ২৬৯ নং আয়াতটি, যেখানে জ্ঞানকে সর্বশ্রেষ্ঠ দান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য কোরআনি নির্দেশনা।
মূল আয়াত: জ্ঞান—এক মহা কল্যাণ
আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-বাকারার ২৬৯ নং আয়াতে ইরশাদ করেন:
“يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ ۚ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ”
“তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা (জ্ঞান ও বুদ্ধিবিবেক) দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই তাকে প্রভূত কল্যাণ দেওয়া হয়েছে। আর বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।”
(সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৬৯)
এ আয়াতে “আল-হিকমাহ” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা সাধারণ অর্থে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দীনের গভীর উপলব্ধি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে বুঝায়। এই আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ দান, যা তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আর এই দান প্রাপ্তি মানেই যেন ব্যক্তি পেয়ে গেল অগণিত কল্যাণের ভাণ্ডার।
জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সম্পর্কিত আরও কোরআনি নির্দেশনা
এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কোরআনের আরও বহু জায়গায় জ্ঞানের মর্যাদা ও তার ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আয়াত তুলে ধরা হলো:
১. জ্ঞান ছাড়া আমল অন্ধকারে পথ চলার মতো
আল্লাহ বলেন:
“قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ”
“বলো, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? নিশ্চয়ই বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ করে।”
(সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯)
এ আয়াতটি জ্ঞানীদের অবস্থানকে অজ্ঞদের থেকে উচ্চতর বলে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিই আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করেন।
২. জ্ঞানই আল্লাহর ভয়ের মূল উৎস
জ্ঞান কেবল তথ্যগত দক্ষতা নয়; বরং তা মানুষকে আল্লাহর সঠিক পরিচয় ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে সচেতন করে। আল্লাহ বলেন:
“إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ”
“নিশ্চয়ই তাঁর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, তারাই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, ক্ষমাশীল।”
(সূরা ফাতির, ৩৫:২৮)
অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞান শেষ পর্যন্ত মানুষকে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা, আনুগত্য ও ভয়-ভক্তি প্রদান করে।
৩. জ্ঞান অর্জন করা ফরজের পর্যায়ে
আল্লাহ তা’আলা জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব এতটাই বৃদ্ধি করেছেন যে, যারা জানে না, তাদের জ্ঞানীদের প্রশ্ন করে জানতে হবে। আল্লাহ বলেন:
“فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ”
“অতএব তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।”
(সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৩)
এ আয়াতটি শিক্ষার পদ্ধতি ও জ্ঞানীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।
৪. জ্ঞান লাভের পরামর্শ ও দীক্ষা
আল্লাহ নিজ নবীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
“وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا”
“আর বলো, হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করো।”
(সূরা তাহা, ২০:১১৪)
এটি প্রমাণ করে যে, জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া কখনো শেষ হয় না। নবীজির জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করার নির্দেশ পাওয়ার অর্থ হলো, মুমিনকেও আজীবন জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকতে হবে।
বিশ্লেষণ: প্রভূত কল্যাণ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“যাকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাকে প্রভূত কল্যাণ দেওয়া হয়েছে”—এই কথার মধ্যে নিম্নলিখিত কল্যাণসমূহ নিহিত রয়েছে:
১. আল্লাহর সঠিক পরিচয় লাভ: জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ তার স্রষ্টাকে জানতে পারে এবং শিরক ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে বাঁচে।
২. পার্থিব ও পারলৌকিক সাফল্য: সঠিক জ্ঞান মানুষকে দুনিয়ার কাজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং আখিরাতের পথ নির্দেশ করে।
৩. অন্যের জন্য কল্যাণের বাহন হওয়া: জ্ঞানী ব্যক্তি সমাজের দিশারি হয়ে ওঠেন, অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন।
৪. আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া: প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে, যা সকল কল্যাণের মূল।
সূরা আল-বাকারার ২৬৯ নং আয়াতটি জ্ঞানকে “প্রভূত কল্যাণ” বলে অভিহিত করার মাধ্যমে ঘোষণা করেছে যে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান। কোরআনের অন্যান্য আয়াতের আলোকে দেখা যায়, এই জ্ঞান অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়, জ্ঞানী ও অজ্ঞের মধ্যে পার্থক্য স্থাপন করে এবং মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপযুক্ত করে তোলে। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত জ্ঞানার্জনকে জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে সর্বদা জ্ঞান বৃদ্ধির প্রার্থনা করা।