×
×
Thursday, 29 October, 2026, 9:10 am


“বাংলাদেশের মিডিয়া পাড়ায় সংকট: আত্মহত্যা ও পরিবার ভাঙনের মহামারি, সুস্থ জীবনের সন্ধান”

বাংলাদেশের মিডিয়া পাড়া বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক মূল্যবোধ, পেশাগত চাপের অতিরিক্ত বোঝা, এবং ব্যক্তিজীবনে অস্থিরতা—এই তিনের মিলিত প্রভাবে দিন দিন বেড়েই চলেছে আত্মহত্যার ঘটনা ও পরিবার ভাঙনের গল্প। যা একসময় ব্যক্তিগত দুঃখজনক ঘটনা ছিল, এখন তা একটি সামাজিক মহামারির রূপ নিচ্ছে ।

সঙ্কটের মূলে কী?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৪-২৫ সালের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তাল সময়ের পর, দেশের শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে । মিডিয়াকর্মীরা এই চাপের সামনের কাতারে রয়েছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি কাভার করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক তীব্র ট্রমা ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (PTSD) আক্রান্ত হয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক সম্পর্কে ।

এই পেশাগত ট্রমার সঙ্গে যোগ হয়েছে পারিবারিক টানাপোড়েন ও আর্থ-সামাজিক অনিশ্চয়তা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য বলতে শুধু রোগমুক্তি নয়, বরং জীবনের চাপ মোকাবিলা করে সৃজনশীল ও ফলপ্রসূভাবে বাঁচার সক্ষমতাকে বোঝায় । কিন্তু বাস্তবে, মিডিয়াপাড়ার অনেক কর্মী সেই সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন। চাকরির চাপ, ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতা, এবং দ্রুত খবর পরিবেশনের প্রতিযোগিতা তাদের মানসিক ভিতকে ক্রমশ দুর্বল করছে। এর ফলস্বরূপ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আস্থার সংকট, ভুল বোঝাবুঝি, এবং সম্পর্কে দূরত্ব বেড়েই চলেছে, যা অনেক সময় বিবাহবিচ্ছেদ বা সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যমে শেষ হচ্ছে।

আস্থার সংকট থেকে পরিবার ভাঙন

মিডিয়ায় কাজ করা মানুষের জীবনযাত্রা প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির বাইরে। অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত অবস্থান, এবং সব সময়ই খবরের পেছনে ছোটা—এই বাস্তবতা অনেক সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে অনভিপ্রেত আচরণ হিসেবে ধরা দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় ডিজিটাল মাধ্যমে অতিসক্রিয়তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন। ফলে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে পারস্পরিক বিশ্বাস। অথচ সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার মূল ভিত্তি হলো এই আস্থা ও বিশ্বাস ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সামাজিক কুসংস্কার ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার অলিখিত নিষেধাজ্ঞা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। মানসিক চাপ বা সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ না থাকায়, তা জমে জমে বিষাক্ত আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে ব্যক্তি নিজেকে একেবারে একা ও নিঃসঙ্গ মনে করেন এবং হতাশার ঘোর থেকে মুক্তির পথ হিসেবে আত্মহত্যার মতো অপূরণীয় পথ বেছে নেন ।

আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ জীবন: উত্তরণের পথ

এই গভীর সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতন ও সমন্বিত উদ্যোগ। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ জীবনযাপন এখন সময়ের দাবি।

১. মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া: নিজের মানসিক অসুস্থতাকে অস্বীকার না করে সেটাকে শারীরিক অসুস্থতার মতোই গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাংবাদিকদের নিজেদের মানসিক চাপকে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে, প্রয়োজন হলে পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া উচিত ।

২. পরিবারে খোলামেলা আলোচনা: পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিজের পেশাগত চাপ ও অনুভূতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা গড়ে তুলতে হবে। একজন সাংবাদিক তার পরিবারের কাছে শুধুই ‘সংবাদ সংগ্রহকারী’ নন, তিনি একজন সংবেদনশীল মানুষ। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বোঝার ও সমর্থন দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

৩. সুস্থ জীবনাচার চর্চা: নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, এবং ডিজিটাল জগৎ থেকে কিছুটা বিরতি নেওয়া (ডিজিটাল ডিটক্স) মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোর বাধ্যবাধকতা না রেখে, ধীরগতির কিছু সময় নিজের জন্য রাখা জরুরি।

৪. প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা: সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের কর্মীদের জন্য নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘মনের বন্ধু’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ আয়োজিত সাংবাদিকদের জন্য কর্মশালার মতো উদ্যোগগুলোকে নিয়মিত ও ব্যাপক আকারে নিতে হবে ।

৫. সামাজিক সচেতনতা ও আইনি কাঠামো: ২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইন ও ২০২২ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে । স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশের মিডিয়াপাড়া বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এখানে সাফল্য আর ব্যর্থতার সংজ্ঞা শুধু খবরের শিরোনামে সীমাবদ্ধ নয়, এর বিস্তার ঘটেছে মানুষের মনে ও পরিবারের চৌকাঠে। আত্মহত্যা ও পরিবার ভাঙনের এই ক্রমবর্ধমান ধারা থামাতে হলে আমাদের বুঝতে হবে, সুস্থ মন ও সুস্থ পরিবারই একটি শক্তিশালী সমাজের ভিত্তি। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে। শুধু বেঁচে থাকা নয়, সুস্থ ও সার্থকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

[atn_photocard]
আরও