ফলনের আধিক্যে অভাব: কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও সরকারি হস্তক্ষেপের অনিবার্যতা
অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি। মেধাবী ও পরিশ্রমী কৃষকরা সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ধান, পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল ফলিয়ে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত শঙ্কাজনক। ফলন যত ভালো হয়, আশ্চর্যজনকভাবে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক সময় ততই বাড়ে। প্রচুর ফলনের পরেও ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে তাঁরা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হন। এই প্রতিবেদনে সেই সমস্যার গভীরে যেয়ে একটি সম্ভাব্য স্থায়ী সমাধানের পথ অনুসন্ধান করা হয়েছে, যা কৃষক ও সাধারণ জনগণ—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে দেশীয় অর্থনীতিকে চক্রাকারে সচল রাখতে পারে।
সমস্যার পরিচিতি: ফলনের আধিক্যই কি অভিশাপ?
মৌলিক অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, জোগান বাড়লে চাহিদা স্থির থাকলে দাম কমে। মরসুমের পর মরসুমে বাজারে বিপুল পরিমাণ ফসল এলেও তার সংরক্ষণ (স্টোরেজ) ও প্রক্রিয়াকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা উৎপাদনের পরপরই ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা (দালাল, আড়তদার) কৃষকের ফসল অত্যন্ত কম দামে কিনে নেন। অন্যদিকে, এই ফসল যখন খুচরো বাজারে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছয়, তখন তার দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদনকারী কৃষক যেমন লাভবান হতে পারেন না, তেমনই ভোক্তা সাধারণকেও বেশি দাম দিতে হয়। মাঝখানের এই বিশাল ফারাকটাই কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি।
সরকারি হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য মডেল:
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সক্রিয় ও বৃহৎ পরিসরে হস্তক্ষেপ জরুরি। সরকারকে সরাসরি বাজার ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে হবে, একজন বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে।
১. ন্যূনতম সমর্থন মূল্যের নিশ্চয়তা: সরকারকে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট ফসলের জন্য ন্যূনতম সমর্থন মূল্য (Minimum Support Price – MSP) ঘোষণা করতে হবে, যা কৃষকের উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভজনক হয়। এরপর ফলনের মৌসুমে সরকারি সংস্থা বা কৃষক সমবায় সমিতিগুলিকে দিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে এই নির্ধারিত মূল্যে ফসল কেনা শুরু করতে হবে। এর ফলে কৃষককে মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হতে হবে না।
২. অভ্যন্তরীণ বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ: সরকার কর্তৃক ক্রীত এই বিপুল পরিমাণ ফসল (যেমন চাল, ডাল, সবজি) প্রথমেই যেতে পারে রাষ্ট্রায়ত্ত বিতরণ ব্যবস্থার (Public Distribution System – PDS) মাধ্যমে। এর ফলে দুটি বড় সুবিধা হয়:
★ দেশের গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষজন খুব সস্তায় খাদ্যশস্য পাবেন, যা তাদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
★ বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
৩. আমদানি নির্ভরতা হ্রাস: বর্তমানে বিভিন্ন কারণে দেশে বিদেশি ফল, ডাল, এমনকি কিছু শাকসবজিও আমদানি করা হয়। আপনার চিন্তা অনুযায়ী, বিদেশ থেকে পণ্য কেনার পরিবর্তে সরকার যদি সেই টাকা দিয়ে দেশীয় কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনে, তাহলে অর্থ দেশের ভিতরেই ঘুরবে। এটি একটি সুস্থ অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করবে, যেখানে দেশের টাকা দেশের মানুষের হাতেই থাকবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
*সুবিধা ও সম্ভাবনা:*
★ কৃষকের জন্য: আর্থিক সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা। উৎপাদন বৃদ্ধির উৎসাহ। ঋণের বোঝা কমে যাওয়া।
★ সাধারণ মানুষের জন্য: ভর্তুকিযুক্ত মূল্যে খাদ্যশস্যের স্থায়ী জোগান। বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে থাকা।
★ রাজ্যের অর্থনীতির জন্য: অর্থনীতির চাহিদা চক্র (Demand Cycle) সক্রিয় থাকে। কৃষকের হাতে টাকা এলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং আমদানি নির্ভরতা কমে।
★ মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ: সরাসরি সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা চালু করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও শোষণ কমে আসবে।
*চ্যালেঞ্জ ও করণীয়ঃ*
এই মডেল বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন—
★ পর্যাপ্ত শস্যভাণ্ডার বা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা করা।
★ সরকারি ক্রয়কেন্দ্রগুলিতে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
★ কৃষকদের নিবন্ধন ও উৎপাদনের সঠিক তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তোলা।
★ বিভিন্ন ফসলের জন্য উপযুক্ত MSP নির্ধারণে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করা।
কৃষক শুধু ফসল ফলান না, তিনি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনীতির ভিত গড়ে তোলেন। তাঁকে শুধু উৎপাদনকারী না রেখে লাভের অংশীদার করে তুলতে হলে সরকারকে বাজারের এই মৌলিক অসংগতি দূর করতে হবে। ‘উৎপাদনেই সাফল্য’ নয়, ‘ন্যায্যমূল্যই সাফল্য’- এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকার যদি সরাসরি ক্রয় ও অভ্যন্তরীণ বিতরণের মডেলটি গ্রহণ করে, তাহলে কেবল খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং কৃষক ও সাধারণ মানুষ—উভয়ের মুখে হাসি ফুটবে। দেশের টাকা দেশের ভিতরেই থেকে অর্থনীতিকে চক্রাকারে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটি কোনো দান নয়, বরং একটি কৃষিপ্রধান দেশের জন্য টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক নীতি।