United Nations–এর শান্তিরক্ষা মিশন ও বৈশ্বিক সংকটঃ
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে যেমন সংঘাতের ধরন জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক বিভক্তি নিরাপত্তা পরিষদে ঐকমত্য গড়ে তোলার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে শান্তিরক্ষা মিশনের সংখ্যা ও আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৫ সালে যেখানে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১২ হাজার শান্তিরক্ষী মোতায়েন ছিল, ২০২৫ সালের শুরুতে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৮ হাজারে । সর্বশেষ বড় মাত্রার বহুমাত্রিক শান্তিরক্ষা মিশনটি গঠিত হয় ২০১৪ সালে ।
এই সঙ্কুচিত অবস্থার পেছনে মূল কারণ হলো বৈশ্বিক বিভক্তি এবং মিশনগুলোর ওপর বেড়ে চলা জটিল চাপ। বর্তমান শান্তিরক্ষীরা যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছেন, তা অভূতপূর্ব। নিচের ছকে কয়েকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হলো:
প্রধান চ্যালেঞ্জ বর্ণনা
পরিবর্তিত সংঘাতের ধরণ যুদ্ধ আরও প্রাণঘাতী, জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে ।
নতুন হুমকি সন্ত্রাসবাদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোনের মতো নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার শান্তিরক্ষীদের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে ।
ভুল তথ্য প্রচার শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও প্রতিকূলতা তৈরি করছে, যেমনটি ডিআরসিতে MONUSCO-র ক্ষেত্রে দেখা গেছে ।
অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও স্বল্প সম্পদ মিশনগুলোর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ক্রমাগত বাড়লেও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন ও আর্থিক সম্পদের যোগান নেই ।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ও মানবাধিকার: অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা
শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর অংশ হিসেবে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জাতিসংঘ প্রধান মানবাধিকার লঙ্ঘনের পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন, যা শুধু ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর হওয়ার সুযোগ দেয় না, বরং জাতিসংঘের শান্তি মিশনের আদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও বটে । তবে, সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদে ম্যান্ডেট নবায়নের সময় মানবাধিকার, নারী-শান্তি-নিরাপত্তা এবং জলবায়ু-শান্তি-নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো বাদ দেওয়ার জন্য চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে । বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলি মনে করে যে, এই ধরনের বিষয় নিরাপত্তা পরিষদের কাজের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয় ।
শান্তিরক্ষীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও একটি বড় ইস্যু। শান্তিরক্ষা মিশনে যৌন নিপীড়ন ও শোষণের ঘটনা রোধ এবং দুর্ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন এবং অপরাধী ইউনিট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ।
নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা: বিভক্তি ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
জাতিসংঘ সনদের ২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রাথমিক দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের ওপর ন্যস্ত । কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে এই পরিষদের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “একটি বিভক্ত নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর সমাধান দিতে পারে না” এবং পরিষদের ঐক্যের অভাবে বিশ্ব “আইনের শাসন” পরিবর্তে “জঙ্গলের আইন” দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ।
এই বিভক্তি সত্ত্বেও, সম্প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে:
· রেজোলিউশন ২৭১৯: আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন শান্তি অভিযানের জন্য জাতিসংঘের বরাদ্দকৃত তহবিল ব্যবহারের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে ।
· সংস্কার উদ্যোগ: ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত ‘ভবিষ্যতের জন্য চুক্তি’ (Pact for the Future) শান্তি অভিযানগুলোকে আরও চটপটে ও উপযোগী করে তোলার আহ্বান জানিয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে ।
শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে ‘অ্যাকশন ফর পিসকিপিং’ (A4P) উদ্যোগের মতো সংস্কার প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাব সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে ।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। নামিবিয়ায় সফল রাষ্ট্র গঠন থেকে শুরু করে বর্তমান সংকটপূর্ণ অঞ্চলে প্রাণ বাঁচানো পর্যন্ত এই মিশনগুলোর সাফল্যের নজির রয়েছে । কিন্তু নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে এবং কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দৃঢ় রাজনৈতিক সমর্থন, বাস্তবসম্মত ম্যান্ডেট এবং নিরাপত্তা পরিষদের মধ্যে বিভক্তি দূর করে যৌথ নেতৃত্ব প্রদান। সংকট মোকাবিলায় ব্যয় করার চেয়ে সংকট প্রতিরোধে বিনিয়োগই বেশি জরুরি বলে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা ।