×
×
Friday, 30 October, 2026, 9:37 pm


পবিত্র রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার: কৃষকের অশ্রু, ভোক্তার দীর্ঘশ্বাস

রমজানের প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর বাজারগুলোতে স্বস্তির হাওয়া এখনও অস্থায়ী। একদিকে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে শহরের ক্রেতারা সেই পণ্যই কিনছেন কয়েকগুণ দামে। পবিত্র মাস উপলক্ষ্যে নিত্যপণ্যের বর্ধিত চাহিদা যেমন দাম চাপ বাড়িয়েছে, তেমীন একটি খণ্ডিত ও অস্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থাপনা এই বৈষম্যকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। রোজার বাজার স্থিতিশীল রাখার তোয়াক্কা না করে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের রোজার টেবিলকে প্রায় বিলাসিতায় পরিণত করেছে।

শুরুতেই যে চিত্র চোখে পড়ে

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী ও মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজার ঘুরে ওঠা এই প্রতিবেদকের চোখে যে ধাক্কা লাগে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রোজার শুরুতে যে দাম চোখ উঠেছিল, তা কিছুটা কমলেও এখনও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ব্যবসায়ীরা বলছেন সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু দাম কমছে ধীরে ধীরে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মুরগির দাম কিছুটা কমে ১৫৫-১৬৫ টাকায় দাঁড়ালেও, শুরুর দিকে তা ছিল ২০০ টাকার উপরে । সবজির দামও অস্থির। শুরুর দিকে যে লেবু ১০০-১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছে, এখন মানভেদে তা ৪০-৬০ টাকায় নামলেও, বেগুন ও চিচিঙ্গার মতো মৌসুমি সবজি এখনও ১০০ টাকার উপরে । অথচ বাজারের এই অস্থিরতার শুরুতে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। টিবিএসের তথ্যমতে, রমজানের আগে বাজারে চারটি লেবুর দাম ৮০-১০০ টাকা ছুঁয়েছিল, যা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ ।

যে সাপ্লাই চেইনে তছনছ হয় ন্যায্যমূল্য

কেন কৃষকের ক্ষেতে উৎপাদিত পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায় ভোক্তার ঝুড়িতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের কৃষি বাজার ব্যবস্থার দুর্বল চেইনের দিকে তাকাতে হয়। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি সাধারণ সবজি কৃষকের কাছ থেকে গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছাতে কমপক্ষে পাঁচটি স্তর অতিক্রম করে— ফড়িয়া, আড়তদার, বেপারি, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা ।

টাঙ্গাইলের কৃষক হাশেম মিয়ার মতো হাজারো কৃষক তাদের উৎপাদিত লাউ বিক্রি করেছেন ১৫-২০ টাকায়। অথচ সেই লাউ কারওয়ান বাজারে পৌঁছে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে ৬০-৭০ টাকায় । এই দীর্ঘ চেইনের প্রতিটি স্তরেই মুনাফা যোগ হয়, কিন্তু কৃষকের ভাগ্যে জোটে শুধু উৎপাদন খরচের কান্না। নিউ এজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোরো ধানের ক্ষেত্রেও চিত্র একই। সরকার নির্ধারিত মূল্য ৩০ টাকা হলেও খোলাবাজারে কৃষক তা ২২-২৫ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা এই অস্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থাকেই দুষেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মজুতদারি, সংরক্ষণাগারের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীন আমদানি নীতির কারণেই কেবল দাম বেড়ে যায় না, বরং কৃষকও লোকসানের মুখে পড়েন। উদাহরণ হিসেবে আলুর কথা বলা যায়। গত বছর আগস্ট-অক্টোবরের বন্যায় দাম বেড়ে গেলে, হিমাগারে আলু আটকে রেখে বাজার অস্থিতিশীল করা হয়, কিন্তু উৎপাদন মৌসুমে কৃষক তা বিক্রি করতে পারেননি ন্যায্যমূল্যে ।

নজরদারির নামে নিষ্ক্রিয়তা

রমজানজুড়ে বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভোক্তা অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের অভিযান চললেও, তার ফলাফল কি সত্যিই ভোক্তার পকেটে লাভ হিসেবে ফিরেছে? চট্টগ্রামের উপভোক্তারা বলছেন, শুরুতে লেবু ও মুরগির দাম ছিল অস্বাভাবিক। সেখানকার ডেপুটি কমিশনার ব্যবসায়ীদের সতর্ক করলেও বাস্তবে দাম সহনশীল রাখতে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়েছে ।

নিউ এজ সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের নামে শুধু ভোক্তা পর্যায়ে তৎপরতা চালিয়ে লাভ নেই। কৃষক পর্যায় থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহনে দখলদারি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে না পারলে বাজার স্থিতিশীল হবে না । পরিবহন খরচ ও পণ্যের অপচয়— এই দুই মিলিয়েই প্রকৃত মূল্য বৃদ্ধি পায়, যা শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়।

কৃষক থেকে ভোক্তা: এক অসম যুদ্ধ

বাংলাদেশের খাদ্য অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেন কৃষক। কিন্তু এই কৃষক ঋণের বোঝায় জর্জরিত। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের নিবন্ধে বলা হয়েছে, কৃষকের ঋণ পরিশোধের তাগিদেই ফসল কাটার পরপরই কম দামে ফড়িয়ার কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। অন্যদিকে শহুরে ভোক্তা, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার, বেড়েই চলা মূল্যস্ফীতির কারণে পুষ্টিকর খাবার কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন ।

একটি কার্যকর ও ন্যায্য কৃষি বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য খর্ব করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকের সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার তৈরি করা, হিমাগার ও কোল্ড স্টোরেজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং কৃষক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে ।

পবিত্র রমজান মাস আত্মসংযমের। কিন্তু এই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য সংযমই হয়ে ওঠে একমাত্র পথ। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যের মূল্য রাখাও সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। বাজার ব্যবস্থার এই অস্বচ্ছতা ও অদক্ষতা দূর করতে স্থায়ী ও কাঠামোগত সংস্কার না হলে, আগামী রমজানেও একই চিত্র দেখতে বাধ্য হবে দেশবাসী।

[atn_photocard]
আরও