×
×
Thursday, 29 October, 2026, 4:27 pm


অলিভিয়ে রোয়ের বিশ্লেষণ: কেন ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যর্থ হয়?

ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইসলাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অলিভিয়ে রোয়ে তার ১৯৯২ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ “L’échec de l’Islam politique” (দ্য ফেইলিওর অফ পলিটিক্যাল ইসলাম) এ একটি সাহসিক অভিমত ব্যক্ত করেন। তার মতে, রাজনৈতিক ইসলাম বা ইসলামপন্থা একটি ব্যর্থ মতাদর্শ । রোয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্রব্যবস্থায় এগিয়ে যেতে পারে না বা টেকসই শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, কারণ তাদের মতাদর্শ ও কর্মপদ্ধতিতে কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। এই প্রতিবেদনে অলিভিয়ে রোয়ের তত্ত্বের আলোকে সেই সীমাবদ্ধতাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

১. অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুপস্থিতি

রোয়ের প্রধান যুক্তিগুলোর একটি হলো, ইসলামপন্থীদের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। তিনি দেখান যে, ‘ইসলামী অর্থনীতি’ বা ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য মূলত অলঙ্কারমূলক, যার বাস্তব ভিত্তি দুর্বল । রোয়ের মতে, ১৯৬০-এর দশকের তৃতীয় বিশ্ববাদী (থার্ড ওয়ার্ল্ডিজম) মতাদর্শের মতোই ইসলামপন্থীরা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য পপুলিস্ট বক্তব্য ব্যবহার করে, কিন্তু শাসনক্ষমতায় এলে তারা কোনো নতুন অর্থনৈতিক মডেল উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। তারা যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলে, তা মূলত ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরতন্ত্রেরই একটি ধর্মীয় সংস্করণ মাত্র ।

২. আন্তর্জাতিকতা থেকে জাতীয়তাবাদে সঙ্কুচিত

ইসলামপন্থীদের আদর্শ ছিল একটি আন্তর্জাতিক ইসলামী রাষ্ট্র বা উম্মাহ গঠনের স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবে তারা জাতি-রাষ্ট্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। রোয়ে দেখান, সময়ের সাথে সাথে ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলো তাদের আন্তর্জাতিক আদর্শ বাদ দিয়ে বর্তমান জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। তারা প্রকৃতপক্ষে একটি ‘ইসলামী আন্তর্জাতিক’ গঠনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে উম্মাহ গঠনে মনোযোগ দেয়, যা কার্যকরভাবে এক ধরনের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে পরিণত হয় । এই সঙ্কুচিত দৃষ্টিভঙ্গি তাদের বৈশ্বিক ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের মূল স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

৩. রাষ্ট্র দখলের চেয়ে সমাজ নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার

রোয়ের ভাষ্যমতে, ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার চেয়ে ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। তিনি এই ধারাকে ‘নব্য-মৌলবাদ’ (নিও-ফান্ডামেন্টালিজম) বলে অভিহিত করেছেন। এই ধারায় ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিবর্তে সমাজে শরিয়া আইন ও নৈতিকতার শাসন কায়েমের ওপর জোর দেয় । ফলে তারা রাষ্ট্রের কাঠামো ও প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নয়নের চেয়ে পোশাক, মদ নিষিদ্ধকরণ, লিঙ্গ পৃথকীকরণের মতো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইস্যুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটি তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় শক্তিতে পরিণত হতে বাধা দেয়।

৪. রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে ব্যর্থতা

রোয়ের বিখ্যাত উক্তি হলো, “রাজনৈতিক ইসলাম ক্ষমতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না” (Political Islam does not pass the test of power) । ইরান ও আফগানিস্তানের তালেবান শাসনের উদাহরণ টেনে তিনি দেখান যে, যখনই ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসে, তখনই তারা শাসন পরিচালনার বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে । রাষ্ট্র পরিচালনার জটিলতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিক সেবা প্রদানের মতো বিষয়গুলো তাদের মতাদর্শের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়। ফলে তারা অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। ইরানের তরুণ প্রজন্ম ইসলামী শাসনের প্রতি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে এবং তালেবানদের মধ্যে মতাদর্শগত বিশুদ্ধতা বনাম বাস্তবতা মোকাবিলার দ্বিধা দেখা দিয়েছে ।

৫. মতাদর্শের সঙ্কট: তাকফির ও সহিংসতার সীমাবদ্ধতা

ইসলামপন্থীদের মধ্যে একটি বড় অংশ সমাজকে ‘ইসলামী’ ও ‘অইসলামী’ এই দ্বৈত ভাগে ভাগ করার এবং অন্য মুসলমানদের ‘কাফির’ ঘোষণা করার (তাকফির) প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এই কঠোর অবস্থান তাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয় । পরবর্তীকালে মিশরসহ বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো বুঝতে পারে যে সহিংসতা ও তাকফিরের রাজনীতি তাদের কোনো ইতিবাচক ফল দেয়নি, এবং তাদের এই মতাদর্শগত অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। তবে এই আত্মসমালোচনা ও সংশোধনী প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে তাদের আদি মতাদর্শ রাজনৈতিকভাবে টেকসই নয় ।

অলিভিয়ে রোয়ের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, ইসলামপন্থীদের মূল দুর্বলতা হলো একটি সুসংহত ও বাস্তবসম্মত রাষ্ট্র পরিচালনার রোড ম্যাপের অভাব। অর্থনৈতিক মডেলের অনুপস্থিতি, আন্তর্জাতিকতা থেকে জাতীয়তাবাদে সঙ্কুচিত হওয়া, রাষ্ট্র কাঠামোর চেয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগ দেওয়া এবং ক্ষমতার পরীক্ষায় টিকতে না পারার কারণে তারা একটি কার্যকর ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। রোয়ের মতে, ইসলামপন্থীরা যেখানেই ক্ষমতায় এসেছে, সেখানেই তারা ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরতন্ত্রের একটি ধর্মীয় সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই উপস্থাপন করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত তাদের শাসন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

[atn_photocard]
আরও