×
×
Saturday, 31 October, 2026, 10:24 pm


রোজার আগে বাজারে চড়া ছোলা-চিনি, সবজিতেও দামের আগুন

পবিত্র রমজান মাস শুরুর আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। সাধারণত এই সময়ে নিত্যপণ্যের বাজারে চাহিদা বাড়ায় অস্থিরতা দেখা দেয়। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুত ও বাজার নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দিলেও রাজধানীর বাজারগুলোতে ইতিমধ্যে ছোলা, চিনি ও বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম বাড়তি হাতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, ভোজ্যতেল নিয়ে ক্রেতাদের দুর্ভোগও কমেনি।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং বিভিন্ন বাজার সূত্রে জানা গেছে, রোজার অন্যতম প্রধান উপকরণ ছোলার দাম গত এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী কাঁচাবাজার ও রামপুরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোলা এখন ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা ।

একই অবস্থা চিনির বাজারেও। প্যাকেটজাত চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যদিও খোলা চিনির দাম আরও কিছুটা বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ায় খুচরাতেও এর প্রভাব পড়েছে । তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তির খবরও আছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চিনির দাম কিছুটা কম বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। টিসিবির তথ্যমতে, গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এ বছর চিনির দাম প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ কম ।

সরকার আশ্বস্ত করছে যে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানি বাড়ানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) রোজার প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বেড়েছে ৪.১ শতাংশ। ছোলা আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৯৬ লাখ টনে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১.৬৪ লাখ টন । ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়মিত ছোলা খালাস হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে ।

সবজির বাজার: মৌসুম শেষে অস্থিরতা

রোজার আগে সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। শীতকালীন সবজির মৌসুম শেষ হয়ে আসায় এবং চাহিদা বাড়ায় দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেগুন, ঢেঁড়স, করলা, শিম, টমেটোসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। বর্তমানে বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি, শিম ৪০ থেকে ৬০ টাকা, টমেটো ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং করলা ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে ।

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফুলকপির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। প্রতি ফুলকপি এখন ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে । শীতের শেষে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়াকে দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে, আলুর দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও তা আগের তুলনায় কিছুটা কম।

ভোজ্যতেল: সংকট কাটেনি, মিলছে না নায্য দামে

ভোজ্যতেলের বাজারে গত কয়েক মাস ধরে চলমান অস্থিরতা রোজার আগেও কাটেনি। খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি। বোতলজাত তেলের দামও বেড়েছে। জানুয়ারি মাসেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম শতকরা ১.৫৭ ভাগ বেড়েছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় । আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তার প্রভাব না পড়ায় হতাশ ক্রেতারা।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের এক ক্রেতা নিগার পারভীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতি বছর রোজার সময় কিছু জিনিসের দাম বাড়ে, কিন্তু এবার মনে হচ্ছে সব জিনিসের দাম বাড়ছে। ছোলা-চিনি বাড়ছে, সবজি তো আগুন, তার ওপর তেলের এই অবস্থা। সরকার যা-ই বলুক না কেন, আমাদের সংসারের খরচ তো কমছে না।”

স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি: পেঁয়াজ ও মুরগি

স্বল্প পরিসরে স্বস্তির খবরও রয়েছে। দেশি পেঁয়াজের নতুন মৌসুম শুরু হওয়ায় বাজারে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। মানভেদে প্রতি কেজি পেঁয়াজ এখন ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে । খামারের মুরগির দামও কিছুটা কমেছে। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৭০ থেকে ১৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও, সোনালি মুরগির দাম এখনও ২৯০ থেকে ৩০০ টাকার ঘরে ।

ব্যবসায়ীদের দাবি, আশ্বাস প্রশাসনের

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম স্থিতিশীল রয়েছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দাবি, ভোজ্যতেল ব্যতীত অধিকাংশ পণ্যের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে এবং রোজার সময়ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে । বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় রোজার প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তাঁর মতে, এ বছর রোজার বাজার আরামদায়ক হবে এবং কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানি বাড়লেও মজুতদারি ও সিন্ডিকেট কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে না আনলে সাধারণ ক্রেতারা স্বস্তি পাবেন না। বরং বিশ্ববাজারে দাম কমলেও ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে দেশীয় বাজারে দাম না কমানোর প্রবণতা রয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এইচএম সফিকুজ্জামানের মতে, বাজার মনিটরিং খুবই দুর্বল এবং যেখানে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেখানে তার প্রয়োগ নেই। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা সাধারণ ক্রেতার ভোগান্তি কমাতে বাজার স্থিতিশীল রাখার দাবি থাকলেও, রোজা শুরুর আগেই দাম বাড়ার ধারা অব্যাহত থাকলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য ইফতার ও সেহেরি সাজানো কষ্টকর হয়ে উঠবে।

[atn_photocard]
আরও