×
×
Friday, 30 October, 2026, 7:33 pm


কোরআনের আলো: হেদায়াত নাকি বিতর্ক?

মানবজাতির জন্য সঠিক পথের দিশা হিসেবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। এটি শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; বরং একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। যুগে যুগে আগত নবি-রাসুলদের মাধ্যমে প্রেরিত নির্দেশনার চূড়ান্ত রূপ এই কোরআন। এর আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন দৃষ্টান্ত, উপমা ও ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যাতে মানুষ তাদের বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সত্য উপলব্ধি করতে পারে এবং জীবনকে সুন্দর ও শৃঙ্খলাময় করে গড়ে তুলতে পারে।

কিন্তু মানুষের মনোজগৎ অত্যন্ত বিচিত্র। অনেকেই আছেন যারা সত্য ও ন্যায়ের প্রতি আহ্বান শুনেও তা গ্রহণ করতে চান না। অহংকার, পক্ষপাতিত্ব, সন্দেহ আর অযথা তর্ক-বিতর্কের জালে জড়িয়ে পড়ে তারা নিজেদের জন্য পথ রুদ্ধ করে ফেলে। কোরআন বারবার আমাদের সতর্ক করেছে যে, সঠিক পথ দেখানোর পরও মানুষ কেন বিভ্রান্তির পথ বেছে নেয়।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে ফেরাউনের দম্ভ ও অহংকার, কারুনের সম্পদের মোহ, সামুদ ও আদ জাতির সত্য প্রত্যাখ্যান ও বিদ্রোহের করুণ পরিণতির চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। ইতিহাসের এই দৃষ্টান্তগুলো কেবল গল্প বলার জন্য নয়; বরং আমাদের জন্য শিক্ষা, যাতে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করি। তাদের পরিণতি দেখে আমরা বুঝতে পারি, সত্যকে অস্বীকার করার মূল্য কত ভারী।

তারপরও বহু মানুষ সত্য গ্রহণে গড়িমসি করে এবং অজুহাতের পর অজুহাত দাঁড় করায়। এই মনোভাবেরই চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা কাহফের ৫৪ নম্বর আয়াতে। তিনি বলেন:

وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِيْ هٰذَا الْقُرْاٰنِ لِلنَّاسِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ ؕ وَكَانَ الْاِنْسَانُ اَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا
“নিশ্চয়ই আমি এই কুরআনে মানুষের জন্য সকল প্রকার দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আমার বাণী বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি তর্ককারী ও কলহপ্রিয়।” (আল কাহফ- ১৮: ৫৪)

এই আয়াতটি মানবচরিত্রের একটি গভীর সত্য তুলে ধরে। আল্লাহ যেখানে পথ দেখানোর জন্য অসংখ্য দৃষ্টান্ত দিয়েছেন, সেখানে মানুষ সেই দৃষ্টান্ত নিয়ে চিন্তা না করে সেগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে। তারা মূল বার্তা থেকে সরে গিয়ে গৌণ বিষয় নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয়। অথচ যারা প্রকৃত অর্থে হেদায়াত বা সঠিক পথের সন্ধান করে, তাদের জন্য কোরআনের প্রতিটি শব্দ যেন নূরের মতো পথপ্রদর্শক। এটি তাদের মনকে আলোকিত করে, অন্তরকে প্রশান্তি দেয় এবং জীবনকে করে তোলে অর্থবহ।

অন্যদিকে, যারা পূর্বনির্ধারিত মতবাদ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনোভাব নিয়ে কোরআনের কাছে আসে, তারা কখনোই এর পূর্ণতা ও গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না। তারা সত্য গোপন করার জন্যই কেবল নতুন নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করায় এবং তর্কের জাল বিস্তার করে।

সুতরাং, আমাদের কর্তব্য হলো কোরআনের উপদেশগুলো মনোযোগ সহকারে শোনা, হৃদয় দিয়ে বোঝা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা। অযথা বাকবিতণ্ডা, জ্ঞানগর্ভ অহংকার ও গঠনমূলক নয় এমন বিতর্কে লিপ্ত না হয়ে আল্লাহর দেওয়া হেদায়াতকে বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করাই আমাদের জন্য শ্রেয়। কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে পরিচালিত হয়, তার জীবন হয় সাফল্যমণ্ডিত, তার অন্তর থাকে শান্তিময় এবং তার কর্ম হয় কল্যাণকর।

আসুন, আমরা সবাই কোরআনকে শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ না রেখে জ্ঞান-গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনার গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করি। এর আলোকে নিজেদের জীবন গড়ি এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার চেষ্টা করি। কারণ, এটাই আমাদের সাফল্যের চাবিকাঠি।

[atn_photocard]
আরও