কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিং ২০২৭: দক্ষিণ এশিয়ায় ১৬তম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দেশে আবারও শীর্ষে
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রকাশ করেছে ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস: এশিয়া ২০২৭’। এই তালিকায় বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে নিজের জায়গা ধরে রেখেছে দেশের প্রাচীনতম এই প্রতিষ্ঠান। এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৩৬তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অবস্থান ১৬তম।
গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ এই র্যাঙ্কিং প্রকাশ করে কিউএস। ফল প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনার একটি দিক গর্বের, অন্যটি আত্মসমালোচনার। এই প্রতিবেদনে সেই দুই দিকই তুলে ধরা হয়েছে।
এক নজরে এবারের ফলাফল
এবারের কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন সংক্ষেপে এ রকম:
এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অবস্থান ১৩৬তম
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অবস্থান ১৬তম
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম
গত বছরও দেশের শীর্ষস্থানে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি
ধারাবাহিকভাবে দেশের এক নম্বর জায়গা ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। বছরের পর বছর অনেক প্রতিষ্ঠান এই স্থান পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে। সেই প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সবার আগে।
এশিয়াজুড়ে প্রতিযোগিতা: কত বিশ্ববিদ্যালয়, কত দেশ
কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিং প্রতিবছরই আকারে বড় হচ্ছে। এবারের তালিকায় এশিয়ার ২৬টি দেশের ১ হাজার ৭২২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। আগের বছরের তালিকায় ছিল ১ হাজার ৫২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় দুই শ নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়েছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান তালিকায় ঢুকলে আগের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের জায়গা ধরে রাখতে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। শীর্ষ অবস্থানে আছে হংকং বিশ্ববিদ্যালয়। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়। এশিয়ার উচ্চশিক্ষায় চীন, হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশ অনেক বছর ধরে এগিয়ে আছে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শিক্ষার মানে লম্বা সময় ধরে বিনিয়োগ করেছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে ১৩৬তম হওয়া তাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
উপাচার্যের প্রতিক্রিয়া: গর্ব আছে, তবে থেমে থাকার সুযোগ নেই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এই অবস্থানকে আনন্দ ও গর্বের বিষয় বলে মনে করেন। তাঁর মতে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি।
তবে উপাচার্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, শুধু র্যাঙ্কিংয়ে জায়গা ধরে রাখাই বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য নয়। বরং শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান আরও মজবুত করতে চায় কর্তৃপক্ষ। এ জন্য কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
উপাচার্য কয়েকটি অগ্রাধিকারের কথাও তুলে ধরেছেন:
শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করা
গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিধি বিস্তৃত করা
শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা
এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
কীভাবে নির্ধারিত হয় কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিং
অনেকেই জানতে চান, র্যাঙ্কিং আসলে কীভাবে তৈরি হয়। কিউএস বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ঠিক করে। এর মধ্যে রয়েছে:
একাডেমিক সুনাম: শিক্ষাবিদদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়টি কতটা বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানিত
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত: কতজন শিক্ষার্থীর বিপরীতে কতজন শিক্ষক আছেন
গবেষণার মান ও প্রভাব: গবেষণা কতটা মানসম্পন্ন এবং তা কত জায়গায় উদ্ধৃত হচ্ছে
পিএইচডিধারী শিক্ষক: শিক্ষকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীর হার
আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা: দেশের বাইরের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা
আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী: বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি
এই সূচকগুলো দেখলেই বোঝা যায়, র্যাঙ্কিংয়ে ভালো করতে হলে শুধু বড় ক্যাম্পাস বা বেশি শিক্ষার্থী থাকলেই চলে না। গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং শিক্ষকের মান, এই তিনটি বিষয়ে ধারাবাহিক অগ্রগতি দরকার হয়।
গত বছরের তুলনায় কেমন
এই প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ না করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশে শীর্ষে থাকলেও আগের বছরের তুলনায় আঞ্চলিক তালিকায় চার ধাপ পিছিয়েছে। গত বছরের এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল ১৩২তম। তার আগের বছর সেটি ছিল ১১২তম। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে এশিয়ার তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমেছে।
এর একটি কারণ হতে পারে প্রতিযোগিতার চাপ। অন্য দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের মান ধরে রাখলেও তুলনামূলক অবস্থান কমে যেতে পারে। আবার র্যাঙ্কিংয়ের সূচকগুলোতে নিজের দুর্বল জায়গাগুলো উন্নত না হলে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে সংখ্যার ওঠানামাকে শুধু সাফল্য বা ব্যর্থতার চোখে না দেখে সামগ্রিক প্রবণতা হিসেবে বোঝা জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাতেও একই চিত্র। গত বছর দক্ষিণ এশিয়ায় ঢাবির অবস্থান ছিল ১৭তম। এবার সেটি ১৬তম। এটি ছোট হলেও একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
বাংলাদেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা
এবারের র্যাঙ্কিংয়ে দেশের উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক চিত্রও উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় এবার তালিকায় জায়গা পেয়েছে। প্রথমবারের মতো এই সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। গত বছর তালিকায় ছিল ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয়।
দেশের তালিকায় ঢাবির পরেই রয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (এনএসইউ)। প্রতিষ্ঠানটি এশিয়ায় নিজের ১৪৯তম অবস্থান ধরে রেখেছে। তৃতীয় স্থানে থাকা বুয়েট ১৪ ধাপ নেমে ১৭৯তম হয়েছে।
কিউএস জানিয়েছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১২টি অবস্থান উন্নত করেছে, সাতটি আগের জায়গায় আছে এবং ২৭টি পিছিয়েছে। ছয়টি প্রতিষ্ঠান এবারই প্রথম তালিকায় এসেছে। এখানে একটি মিশ্র চিত্র দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, তবে বেশির ভাগের অবস্থান কমেছে। এশিয়ার প্রথম ৫০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও ১৬ থেকে কমে ১৪ হয়েছে।
এই তথ্য বলছে, তালিকায় নাম থাকাটা এখন তুলনামূলক সহজ হচ্ছে। কিন্তু উপরের দিকে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে ঢাবি কোথায়
এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ের পাশাপাশি কিউএসের বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়েও ঢাবির অবস্থান নজরে রাখার মতো। চলতি বছরের ১৮ জুন প্রকাশিত ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৭’-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টানা তৃতীয় বছর বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় জায়গা ধরে রেখেছে। সেই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল ৬০০তম। দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে ছিল বুয়েট, ৭১১ থেকে ৭২০ এর মধ্যে। এনএসইউ ছিল ৯০১ থেকে ৯৫০ এর মধ্যে। ওই র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের মোট ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পেয়েছিল।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের কিছু সূচকে ঢাবির ফল বেশ ভালো। কর্মসংস্থান ফলাফল সূচকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ৯৫ দশমিক শূন্য পেয়েছে। নিয়োগদাতাদের কাছে সুনামের সূচকে স্কোর ৫০ দশমিক ৮। আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক সূচকে স্কোর ৬১ দশমিক ১। এগুলো থেকে বোঝা যায়, ঢাবির স্নাতকেরা কর্মজীবনে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে পৌঁছান। আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতাও আগের চেয়ে বেড়েছে।
গবেষকদের স্বীকৃতির দিক থেকেও ঢাবি এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ারের ২০২৫ সালের বিশ্বসেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাবির ৩৫ জন শিক্ষক ও গবেষক ছিলেন। দেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এত বেশি নাম ওই তালিকায় আসেনি।
যেসব জায়গায় এখনো দুর্বলতা
র্যাঙ্কিং কেবল প্রশংসার জন্য নয়, দুর্বলতা চিহ্নিত করার একটি আয়নাও। কিউএসের প্রতিবেদনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, পিএইচডিধারী শিক্ষকের হার, আন্তর্জাতিক শিক্ষক এবং বিদেশি শিক্ষার্থীর বিনিময় কার্যক্রমের মতো বিষয়ে দুর্বলতার কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে।
এই সমস্যাগুলো শুধু ঢাবির নয়, দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে ঢাবির মতো বড় ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। এই দুর্বলতাগুলো কাটাতে কয়েকটি কাজ বিশেষভাবে জরুরি:
১. শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত উন্নত করা। ক্লাসে শিক্ষার্থী বেশি হলে একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রত্যেকের দিকে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়। নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং ক্লাসের আকার নিয়ন্ত্রণ এখানে সহায়ক হতে পারে।
২. পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো। শিক্ষকেরা উচ্চতর গবেষণার সুযোগ পেলে শিক্ষা ও গবেষণা দুটোই লাভবান হয়। এর জন্য বৃত্তি, ফেলোশিপ ও বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানো দরকার।
৩. আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আনা। বিদেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এলে ক্যাম্পাসে বৈচিত্র্য আসে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক পরিচিতিও বাড়ে। এ জন্য বিনিময় কর্মসূচি ও যৌথ ডিগ্রি চালুর কথা ভাবা যেতে পারে।
৪. গবেষণার মান ও প্রভাব বাড়ানো। গবেষণা শুধু সংখ্যায় বাড়লে হবে না। প্রকাশনার মান এবং তার বৈশ্বিক উদ্ধৃতিও বাড়াতে হবে। এ জন্য গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাব এবং গ্রন্থাগারের সুবিধা জরুরি।
ঢাবির ঐতিহ্য ও দায়িত্ব
এই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দেওয়া প্রাসঙ্গিক। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের প্রাচীনতম সচল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও গবেষণার প্রতিটি পর্বের সাক্ষী। এখান থেকে পড়াশোনা করে বেরিয়েছেন অসংখ্য শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, লেখক ও গবেষক।
এই দীর্ঘ ঐতিহ্য একদিকে গর্বের বিষয়। অন্যদিকে এটি একটি বাড়তি দায়িত্বও বটে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজের ইতিহাসের ওপর ভর করে বসে থাকলে চলে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রযুক্তি, নতুন গবেষণা পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক মান অর্জনের দিকে এগোতে হয়। উপাচার্যও সেই কথাই বলেছেন। র্যাঙ্কিংয়ে জায়গা ধরে রাখাই শেষ কথা নয়, লক্ষ্য হলো শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন।
র্যাঙ্কিং নিয়ে সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি
কিউএসের মতো র্যাঙ্কিং বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। তবে এটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক অবদান, জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা, শিক্ষার্থীদের নৈতিক গঠন, এসব বিষয় র্যাঙ্কিংয়ের সংখ্যায় ধরা পড়ে না। আবার র্যাঙ্কিংয়ের পদ্ধতি ও সূচক নিয়ে বিশ্বজুড়ে কিছু বিতর্কও আছে।
তবু আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হতে এবং বিদেশে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে র্যাঙ্কিংয়ের গুরুত্ব অনেক। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে র্যাঙ্কিং দেখে থাকেন। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানও সহযোগিতার আগে এসব তালিকায় নজর রাখে। তাই র্যাঙ্কিংকে একেবারে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য বার্তা
এই র্যাঙ্কিং শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি বার্তা বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান, গবেষণায় আগ্রহ, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং প্রকাশনায় অবদানও এতে ভূমিকা রাখে। অ্যালামনাই বা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাফল্য এবং কর্মক্ষেত্রে সুনামও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে শক্ত করে। উপাচার্য যে অ্যালামনাইয়ের সহযোগিতার কথা বলেছেন, তা এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিং ২০২৭-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে সুখবর ও সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে। সুখবর হলো, ১ হাজার ৭২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠিন প্রতিযোগিতায় ১৩৬তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ১৬তম হয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা ধরে রাখা গেছে। সতর্কবার্তা হলো, এশিয়ার তালিকায় গত কয়েক বছরে অবস্থান কিছুটা নেমেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, পিএইচডিধারী শিক্ষক এবং আন্তর্জাতিকীকরণের মতো ক্ষেত্রে উন্নতি না হলে এই প্রবণতা বদলানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ঢাবির মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। তারা যদি গবেষণা, শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নিয়মিত অগ্রগতি দেখাতে পারে, তাহলে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ও অনুপ্রাণিত হবে। উপাচার্যের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবে রূপ পেলে আগামী র্যাঙ্কিংয়ে আরও ভালো খবর আসার সম্ভাবনা আছে। সেই পথে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, প্রশাসন ও সরকার, সবার সম্মিলিত উদ্যোগই হবে মূল শক্তি।