×
×
Tuesday, 3 November, 2026, 4:57 pm


রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ: ৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী কারাগারে, মূল হোতা পলাতক

সাদা কাগজে সিল মেরে ১০৪ জন গ্রাহকের আমানত লুট, বিভাগীয় গাফিলতির অভিযোগ ভুক্তভোগীদের
বিশেষ প্রতিবেদন

সরকারি খাতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ডাকঘর বা পোস্ট অফিস। সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত উপার্জনের একটি অংশ নিরাপত্তার আশায় জমা রাখেন সঞ্চয়পত্রে কিংবা ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে। কিন্তু সেই আস্থার জায়গায় যখন চরম প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটে, তখন তা গোটা ব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেয়। ঠিক তেমনি এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে।
প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাদা কাগজে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে ১০৪ জন সাধারণ গ্রাহকের প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সাতজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজবাড়ী অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতের বিচারক হায়দার আলী আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এই আদেশ দেন।
কারাগারে পাঠানো হলো যাদের
আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো সাতজন হলেন রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার মাহবুবুর রহমান, পোস্টাল অপারেটর নাজমুল হাছান, এমএলএসএস মো. রেজাউল আলম, পোস্টাল অপারেটর এস এম নুরুজ্জামান, পোস্টাল অপারেটর আসমা আক্তার, প্যাকার কাম মেইল ক্যারিয়ার বিউটি রানী দাস এবং পোস্টাল কর্মচারী নুরুল মাসুদ। আদালতের এই আদেশের পর আদালত প্রাঙ্গণে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে তাদের কষ্টের টাকা ফিরে পাওয়ার দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
যেভাবে চলতো অর্থ আত্মসাতের অভিনব জালিয়াতি
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই জালিয়াতির মূল চক্রটি গড়ে উঠেছিল তৎকালীন পোস্টমাস্টার ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে। রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের তৎকালীন পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় মূল কারসাজিটি করতেন লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। ডাকঘরে আসা সরল ও নিরীহ গ্রাহকদের সঞ্চয় হিসাব খোলার প্রলোভন ও মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হতো। এরপর তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা গ্রহণ করা হলেও কোনো অফিশিয়াল পাসবই বা সরকারি রসিদ দেওয়া হতো না।
বিকল্প হিসেবে শিহাব মৃধা ও তার সহযোগীরা অভিনব এক পন্থা বেছে নেন। তারা পোস্ট অফিসের অফিশিয়াল সিল সাধারণ সাদা কাগজে বা স্লিপে ব্যবহার করে গ্রাহকদের টাকা প্রাপ্তির ভুয়া প্রমাণপত্র দিতেন। গ্রাহকরা ভাবতেন সরকারি দপ্তরের সিল যেহেতু আছে, সেহেতু তাদের অর্থ নিরাপদ। এভাবে একে একে ১০৪ জন গ্রাহকের কাছ থেকে আনুমানিক দেড় কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি টাকাও সরকারি কোষাগারে বা মূল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হয়নি। সম্পূর্ণ অর্থই আসামিরা নিজেদের মধ্যে বণ্টন ও আত্মসাৎ করেন।
গ্রাহকদের মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া
দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পর গ্রাহকরা যখন তাদের সঞ্চয়পত্রের মূল বই বা পাসবই পাচ্ছিলেন না, তখন তাদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। পরবর্তীতে জালিয়াতির বিষয়টি পুরোপুরি জানাজানি হলে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে গত ৩০ জুলাই ভুক্তভোগীদের পক্ষে নাসরিন আক্তার বাদী হয়ে তৎকালীন পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে রাজবাড়ী সদর আমলি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় দায়ের করা হয়।
আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযুক্ত ১৩ জন আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। সেই সমনের প্রেক্ষিতে আজ আসামিরা আদালতে উপস্থিত হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন জানান। তবে মামলার গুরুত্ব, জালিয়াতির ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের বিপুল অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বিবেচনা করে বিচারক হায়দার আলী সাতজন আসামির জামিন নামঞ্জুর করেন এবং তাদের তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে অত্যন্ত জোরালো আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট অশোক কুমার ঘোষ ২, অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম লাভলু এবং অ্যাডভোকেট খান মো. জহুরুল হক।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও মূল হোতার পলায়ন নিয়ে ক্ষোভ
এই জালিয়াতির ঘটনায় ডাক বিভাগের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সরাসরি অভিযোগ, গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন রাজবাড়ী ডাকঘরে তদন্তে আসেন, তখন এই জালিয়াতির প্রধান নায়ক লেটার রাইটার শিহাব মৃধা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তারা তাকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে বা পুলিশের কাছে সোপর্দ না করে রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের হাত থেকে ছাড় পেয়েই শিহাব মৃধা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ পলাতক রয়েছেন, যার ফলে তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
পাশাপাশি এই জালিয়াতির মূল আশ্রয়দাতা এবং প্রশ্রয়দাতা হিসেবে অভিযুক্ত তৎকালীন পোস্টমাস্টার বিকাশ বিশ্বাসকে (বিকাশ চন্দ্র) কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি না করে উল্টো সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় বদলি করা হয়েছে। সরকারের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থায় এত বড় দুর্নীতির পরও অভিযুক্তদের এভাবে ছাড় দেওয়া বা সাধারণ বদলি করার বিষয়টিকে সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা “অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা” হিসেবে দেখছেন।
উচ্চপর্যায়ের চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ও ডাক বিভাগে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদের স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক পত্রের মাধ্যমে এই জালিয়াতির ঘটনা অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে ঘটনার প্রকৃত রূপ উন্মোচন, সুনির্দিষ্ট দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পোস্টমাস্টারের বক্তব্য ও জালিয়াতি যেভাবে প্রকাশ্যে এলো
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ এই জালিয়াতির ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, লেটার রাইটার হিসেবে শিহাব মৃধা ২০২১ সাল থেকে এই ডাকঘরে কর্মরত ছিলেন এবং তখন থেকেই তিনি গ্রাহকদের সাথে এই প্রতারণা শুরু করেন।
তিনি আরও বলেন, গ্রাহকরা যখন দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঞ্চয়পত্রের আসল বই পাচ্ছিলেন না, তখন তারা ডাকঘরে এসে ভিড় করতে থাকেন এবং অভিযোগ করতে শুরু করেন। গ্রাহকদের বই না পাওয়ার এই ঘটনা থেকেই মূলত জালিয়াতির বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। গত ৬ জুলাই আমি রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে পোস্টমাস্টার হিসেবে যোগদানের পরই এই অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির ভয়াবহতা এবং গভীরতা আঁচ করতে পারি। সাধারণ সাদা কাগজে সরকারি সিল মেরে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে পুরো বিষয়টি অবহিত করি। পরবর্তীতে ডাক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ও অনুমতিক্রমেই দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু হয়।
গ্রাহকদের আমানত ও ডাক বিভাগের ভবিষ্যৎ
শত শত মানুষের কষ্টের উপার্জিত অর্থ এভাবে সরকারি অফিসের ভেতর বসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলে লোপাট করায় ডাক বিভাগের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী ১০৪ জন গ্রাহকের অনেকেই দিনমজুর, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, বিধবা নারী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য, যারা তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য এই টাকা জমিয়েছিলেন। এখন টাকা হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি, অবিলম্বে পলাতক প্রধান আসামি শিহাব মৃধাকে গ্রেপ্তার করা হোক এবং তাদের আত্মসাৎকৃত পুরো টাকা সরকারি উদ্যোগে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। একই সাথে এই জঘন্য জালিয়াতির পেছনে আর কোনো বড় কর্মকর্তা জড়িত আছেন কিনা, তাও সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানিয়েছেন রাজবাড়ীর সচেতন নাগরিক সমাজ।

[atn_photocard]
আরও