×
×
Thursday, 29 October, 2026, 2:08 pm


পার্বত্য চট্টগ্রামে সবুজ মাল্টার বাম্পার ফলন

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়ে এখন সবুজের সমারোহ। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে পাহাড়ের বাগানগুলোতে সবুজ মাল্টার বাম্পার ফলন হয়েছে। হাটবাজার ছেয়ে গেছে পাহাড়ে উৎপাদিত রসালো ও মিষ্টি সবুজ মাল্টায়। ভালো দাম পেয়ে হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে।

এক নজরে উৎপাদন পরিসংখ্যান

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) চলতি বছরের ফল উৎপাদনের হিসাব অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলাতেই দেশের সবচেয়ে বেশি মাল্টার চাষ হয়, যার পরিমাণ ১৩ হাজার ৪৩ টন (১ কোটি ৩০ লাখ ৪৩ হাজার কেজি)। এর মধ্যে,

· খাগড়াছড়ি: ১ হাজার ৫৬০ একরে ৫ হাজার ৮৩৯ টন

· বান্দরবান: ১ হাজার ১৯৭ একরে ৪ হাজার ৬৮৬ টন

· রাঙামাটি: ৬৬২ একরে ২ হাজার ৫১৮ টন

দেশের মোট উৎপাদিত মাল্টার ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ আসে রাঙামাটি কৃষি অঞ্চল থেকে। জেলা হিসাবে খাগড়াছড়ি এককভাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। রাঙামাটি জেলায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হেক্টর জমিতে মাল্টার বাগান গড়ে তুলেছেন কৃষকরা; হেক্টরপ্রতি ১২ মেট্রিক টন করে মাল্টা উৎপাদিত হচ্ছে।

বাজারে চড়া দাম, লাভবান কৃষক ও ব্যবসায়ী

বর্তমানে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি সবুজ মাল্টা ৯০ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে দাম ৯০ টাকা প্রতি কেজি, যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। পাহাড়ে উৎপাদিত এসব মাল্টা এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে।

উল্লেখ্য, আমদানি করা বিদেশি মাল্টার কেজি যেখানে রাজধানীর বাজারে ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, সেখানে দেশি পাহাড়ি সবুজ মাল্টা ৯০ থেকে ১১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে。 ফলে ক্রেতাদের কাছে দেশি মাল্টার চাহিদা তুঙ্গে।

রাঙামাটির এক মাল্টা চাষি বলেন, “এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলন খুব ভালো হয়েছে। বাগান থেকেই পাইকাররা ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পরিবহন খরচ বাদ দিয়েও প্রতি কেজিতে ভালো লাভ থাকছে।” খাগড়াছড়ির চাষি মংচিং মারমা জানান, এক কানি জমিতে ৫১টি বারি-১ জাতের গাছ লাগিয়ে ইতিমধ্যে লাখ টাকার ফলন বিক্রি করেছেন; গাছে আরও যে পরিমাণ ফল আছে, তা থেকে আরও ২ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন। রাঙামাটি জেলায় মাল্টা বিক্রি করে চাষিরা ৪ থেকে ৫ কোটির বেশি টাকা আয় করেছেন।

স্বাদ ও পুষ্টিতে এগিয়ে পাহাড়ি সবুজ মাল্টা

বাজারে প্রচলিত হলুদ মাল্টার চেয়ে পাহাড়ের সবুজ মাল্টার স্বাদ ও চাহিদা আলাদা। এই মাল্টা আকারে কিছুটা ছোট হলেও খেতে অনেক বেশি মিষ্টি। খোসা পাতলা এবং রসের পরিমাণ বেশি। পাহাড়ে উৎপাদিত এসব মাল্টা সাধারণ মাল্টার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মিষ্টি হওয়ায় এ ফলের চাহিদাও বেশি।

পার্বত্য অঞ্চলে মূলত বারি মাল্টা-১ এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত দার্জিলিং অরেঞ্জ জাতের চাষ বেশি হচ্ছে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এই ফলটি রাসায়নিকমুক্ত ও ফরমালিনবিহীন হওয়ায় ক্রেতাদের আস্থা বেশি।

সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ে মাল্টা চাষে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলের দোআঁশ মাটি, অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত সূর্যালোক এই ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দুই দশক আগে যেখানে জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল পাহাড়ের কৃষকরা, সেখানে এখন বাণিজ্যিক ফলের চাষে ঝুঁকছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিন পার্বত্য জেলায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ফল বিক্রি হয়েছে, যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

তবে সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের অভাব, আধুনিক প্যাকেজিং ও ঢাকাসহ বড় শহরে সরাসরি বিপণনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। খাগড়াছড়িতে ২০২৫ সালে মাল্টার বাম্পার ফলন হলেও খুচরা বাজারে সবুজ মাল্টা বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৬০ টাকায়, অথচ পাইকারি বাজারে কৃষকদের তা বিক্রি করতে হয়েছে ৩০ টাকারও কম দামে। এতে উৎপাদন খরচ মিটিয়েও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছিলেন না তারা। মাল্টা সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে অনেকেই পরিপক্ব হওয়ার আগেই জুলাই মাস থেকে ফল বিক্রি শুরু করেন, যা দাম কমিয়ে দেয়।

এই সমস্যা সমাধানে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, তিন পার্বত্য জেলার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগার) নির্মাণ করা হবে। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে মিনি (কুলবট) কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য রাঙামাটিতে কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পাহাড়ের এই সবুজ মাল্টা শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, দেশের ফলের আমদানি নির্ভরতাও কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহন ভর্তুকি এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামই হতে পারে দেশের মাল্টা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। পাহাড়ের উর্বর মাটিতে সোনা ফলিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কৃষকরা এই ধারা অব্যাহত থাকলে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে আসবে নতুন গতি।

[atn_photocard]
আরও