হিদায়াতের শুরুর ধাপ: কেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং প্রকাশ্য শত্রু উভয়কেই জানা জরুরি, সকল জানার আগে
কুরআনের বাণী সঠিকভাবে বুঝতে এবং তা মেনে চলতে হলে, অন্য যেকোনো কিছু জানার আগে সবার প্রথমে আমাদের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিতকারী দুটি প্রধান শক্তি সম্পর্কে জানতে হবে: আল্লাহ (আমাদের সৃষ্টিকর্তা) এবং ইবলিস (শয়তান, আমাদের প্রকাশ্য শত্রু)।
যাকে আমরা চিনি না, সেই সৃষ্টিকর্তাকে আমরা সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে বা অনুসরণ করতে পারি না। ঠিক তেমনি, শত্রু কীভাবে ফাঁদ পাতে তা না জানলে আমরা সেই ফাঁদ থেকে বেঁচে থাকতেও পারব না। তাই সঠিক পথে চলতে হলে একদম শুরুতেই আমাদের এই দুই শক্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা বাধ্যতামূলক।
নিচে কুরআনের আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত মূল আরবি শব্দসহ এই দুই শক্তির ব্যাপারে একটি সহজ এবং ধারাবাহিক আলোচনা দেওয়া হলো:
*১. তারা আসলে কে? (মালিক বনাম সৃষ্টি)*
প্রথম ধাপ হলো এটি অনুধাবন করা যে, আল্লাহ এবং ইবলিস কোনো যুদ্ধরত দুটি সমান শক্তি নয়। সমস্ত ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ, আর ইবলিস হলো কেবলই একজন অবাধ্য সৃষ্টি।
* আল্লাহ হলেন خَالِق (আল-খালিক — সৃষ্টিকর্তা): তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছুর মালিক। জীবন এবং বিধানের ওপর তাঁর রয়েছে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
”জেনে রেখো, সৃষ্টি করা ও আদেশ দেওয়ার মালিক একমাত্র তিনিই (الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ — আল-খালক ওয়াল-আমর); বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ বরকতময়।” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:৫৪)
* *আমাদের উদ্দেশ্য হলো عِبَادَة (ইবাদাত — আল্লাহর নির্দেশনা মত কাজ ও আনুগত্য):* যেহেতু আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছু দান করেছেন, তাই আমাদের জীবনের মূল দায়িত্ব হলো স্বেচ্ছায় তাঁর আনুগত্য করা।
”আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদাত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি (لِيَعْبُدُونِ — লি-ইয়া’বুদুন)।” (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)
* *ইবলিস একজন جِنّ (জিন):* সে কোনো “ক্ষতিকর দেবতা” বা ঈশ্বরের সমকক্ষ কেউ নয়। সে জিন জাতির (আগুন থেকে তৈরি সৃষ্টি) অন্তর্ভুক্ত। সে অহংকারের কারণে পাপিষ্ঠ হয়েছিল, যাকে আরবিতে বলা হয় كِبْر (কিবর)। সে ভুলবশত নিজেকে হযরত আদম (আঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল।
”সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন (نَار — নার) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি (طِين — ত্বীন) থেকে।'” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১২)
* *শয়তান (شَيْطَان) রূপে পরিবর্তন :* আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে তাকে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করা হয় এবং সে رَجِيم (রাজিম — বিতাড়িত/অভিশপ্ত) হয়ে যায়। তাকে তখন থেকে শয়তান বলা হয়, যার অর্থ “সত্য ও কল্যাণ থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি।”
*২. তারা কীভাবে আমাদের মনে কথা বলে? (সৎ পথপ্রদর্শন বনাম কুপ্ররোচনা)*
সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাদের জানতে হবে এই দুই শক্তি কীভাবে আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
* *আল্লাহ দান করেন هُدَى (হুদাহ — হিদায়াত বা সৎ পথ):* আল্লাহ স্পষ্ট প্রমাণ (بَيِّنَات — বাইয়িনাত) এবং সত্যের মাধ্যমে পথ দেখান। তিনি আমাদের قَلْب (কালব হৃদয় ও মন)-এর উদ্দেশ্যে কথা বলেন এবং ভালো কাজ করার জন্য আমাদের বুদ্ধি বা বিবেক (عَقْل — আকল) ব্যবহার করতে বলেন।
* *শয়তান ব্যবহার করে وَسْوَسَة (ওয়াসওয়াসাহ) কুপ্ররোচনা বা ফিসফিসানি):* শয়তানের এমন কোনো শারীরিক বা জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা নেই যার দ্বারা সে আপনাকে জোর করে খারাপ কাজ করাতে পারে। তার একমাত্র হাতিয়ার হলো মানুষের অন্তরে গোপনে নেতিবাচক চিন্তা ঢুকিয়ে দেওয়া বা ফিসফিস করা।
”যে মানুষের অন্তরে কুপ্ররোচনা বা ফিসফিসানি দেয় (يُوَسْوِسُ — ইউওয়াসউইসু)…” (সূরা আন-নাস, ১১৪:৫)
* *(ফাঁকর— দারিদ্র্য)فَقْر এর ভয় দেখিয়ে ফাঁদ পাতা:*
শয়তান আপনাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত বা চিন্তিত রাখতে পছন্দ করে। উদাহরণস্বরূপ, সে আপনার মনে সম্পদ হারানোর ভয় তৈরি করে যাতে আপনি কৃপণ হয়ে যান এবং অন্যদের সাহায্য করতে না চান। অন্যদিকে আল্লাহ ক্ষমা ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দেন।
”শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের (الْفَقْرَ — আল-ফাকর) ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৬৮)
*৩. কেন আমাদের শত্রুকে সক্রিয়ভাবে চিনতে হবে*
আমাদের ঘরে যে চোর ঢোকার চেষ্টা করছে, তা যদি আমরা নাই জানি, তবে আমরা ঘরকে রক্ষা করতে পারব না। আমরা যদি শয়তানকে অবহেলা করি, তবে একটা সময় তার দেওয়া কুপ্ররোচনাগুলোকে আমরা নিজেদেরই নিজস্ব চিন্তা বলে ভুল করতে শুরু করব।
* *সে একজন প্রকৃত عَدُوّ (আদুউ — শত্রু):* কুরআন আমাদের স্পষ্টভাবে বলে যে শয়তান আমাদের স্পষ্ট শত্রু, তাই আমাদের তাকে শত্রুরূপেই গণ্য করতে হবে এবং কখনো বিশ্বাস করা যাবে না।
”নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু (عَدُوٌّ — আদুউ), সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।” (সূরা ফাতির, ৩৫:৬)
* *শয়তানের পদাঙ্ক বা পদক্ষেপসমূহ (خُطُوَات — খুতুওয়াত):* শয়তান অত্যন্ত ধূর্ত। সে সাধারণত কাউকে একবারেই কোনো বড় পাপের দিকে আহ্বান করে না। বরং সে মানুষকে ধীরে ধীরে, ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে সত্য ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। আপনি যদি তার এসব সূক্ষ্ম কৌশল ও পদক্ষেপ চিনতে না পারেন, তাহলে বুঝতে না বুঝতেই আপনি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারেন।
”হে মানবজাতি!… তোমরা শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করো না (خُطُوَاتِ الشطَانِ — খুতুয়াত আশ-শয়তান)। নিশ্চয়ই সে তোমাদের স্পষ্ট শত্রু।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৬৮)
*৪. কীভাবে আমরা নিজেদের রক্ষা করব (আমাদের ঐশী ঢাল)*
আল্লাহ আমাদের অসহায় করে ছেড়ে দেননি। শয়তানের কুপ্ররোচনা বা খারাপ চিন্তা দূর করার জন্য কুরআন আমাদের একটি সহজ ও শক্তিশালী উপায় শিখিয়েছে।
* *(ইস্তি’আযাহ আশ্রয় প্রার্থনা) اِسْتِعَاذَة -এর মাধ্যমে সাথে সাথে ‘না’ বলা:* যে মুহূর্তে আপনার মনে কোনো খারাপ চিন্তা, হঠাৎ রাগ বা লোভের উদয় হবে, তখনই আপনার উচিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
”আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো উসকানি বা কুপ্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও (فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ — ফাসতা’ইয বিল্লাহ)। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:২০০)
* *(তাওয়াক্কুল تَوَكُّل) – আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা:* কুরআন প্রতিজ্ঞা করেছে যে, যারা সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করে এবং তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা রাখে, তাদের ওপর শয়তানের কোনো আসল ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব (سُلْطَان — সুলতান) চলে না।
”যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে, তাদের ওপর তার (শয়তানের) কোনো আধিপত্য বা ক্ষমতা নেই (سُلْطَانَ — সুলতান)।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯৯)
*সহজ কথায় মূল শিক্ষা*
আল্লাহ সম্পর্কে জানা আমাদের সঠিক পথ, নিরাপত্তা এবং একটি সুন্দর গন্তব্য দান করে। আর ইবলিস সম্পর্কে জানা আমাদের পথের মাঝে লুকিয়ে থাকা ফাঁদগুলো চিনতে সাহায্য করে। এই দুটির সঠিক বোঝাপড়া সবার আগে থাকলেই আমরা নিরাপদে الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (আস-সিরাত আল-মুস্তাকিম সরল সঠিক পথ)-এ চলতে পারব।