এক কিতাব, এক বার্তা: কেন কুরআন ও মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত সার্বজনীন ও চূড়ান্ত?
কুরআনের অকাট্য ব্যাকরণ ও অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের আলোকে ‘আঞ্চলিক নবী’ ও ‘নতুন ওহী’ তত্ত্বের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ
ধর্মীয় আলোচনা ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায়ই একটি বিভ্রান্তিকর দাবি তুলতে দেখা যায়—”কুরআন কেবল আরবদের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল, তাই এটি অনারবদের জন্য নয়; মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন কেবলই একজন আঞ্চলিক নবী।” এই মতবাদের প্রবক্তারা যুক্তি দেন, প্রতিটি ভিন্ন ভাষার জনগোষ্ঠীর জন্য সমসাময়িক নিজস্ব ‘রাসুলুল্লাহ’ (আল্লাহর রাসুল) থাকতে হবে, যিনি তাদের মাতৃভাষায় নতুন কোনো ঐশী কিতাব নিয়ে আসবেন। এমনকি এই দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনের ৩৩:৪০ আয়াতের ‘خَاتَمَ النَّبِيِّينَ’ (খাতামুন-নাবিয়্যিন) শব্দের অর্থ বিকৃত করে বলা হয়, এর অর্থ নবুয়তের সমাপ্তি নয়, বরং পূর্ববর্তী নবীদের “অনুমোদন করা”! ফলে ভবিষ্যতে নতুন বিধান-দাতা রাসুল আসার পথ নাকি উন্মুক্ত!
কোনো বাহ্যিক বা মানুষের তৈরি ঐতিহাসিক বর্ণনার ওপর নির্ভর না করে, কেবল পবিত্র কুরআনের নিজস্ব পাঠ্যের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য এবং আরবি ব্যাকরণের নিখুঁত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ভ্রান্ত ধারণার অসারতা হুবহু তুলে ধরা হলো।
১. বর্তমানের তথাকথিত নবীরা কোথায়? ওহী-ভিত্তিক প্রথম পাল্টা জবাব
যদি বিরোধীদের এই দাবি সত্য হতো যে—প্রতিটি ভাষা ও অঞ্চলের জন্য আলাদা, সমসাময়িক নবী এবং নতুন ঐশী কিতাব রয়েছে তাহলে কুরআনের চিরন্তন নীতি অনুযায়ী তাদের প্রতি প্রথম প্রশ্ন:
> “তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ করো।” (সূরা আল-বাকারাহ, ২:১১১)
>
আজ পৃথিবীতে হাজার হাজার সক্রিয় ভাষা রয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই নতুন স্বাধীন কিতাবগুলো কোথায়? আমাদের এই বাংলা ভূখণ্ডের জন্য, কিংবা বর্তমানের ইংরেজি, স্প্যানিশ বা ম্যান্ডারিনভাষী মানুষের জন্য নতুন, স্থানীয় ওহী নিয়ে আসা স্বাধীন নবী কে? যেহেতু পৃথিবীর কোথাও এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা সমসাময়িক নতুন ঐশী গ্রন্থের সন্ধান নেই, তাই নতুন আঞ্চলিক কিতাবের এই কাল্পনিক দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
২. যুদ্ধে রাসুলের মৃত্যু এবং “নতুন রাসুল” তত্ত্বের ব্যাকরণগত অসারতা
কিছু চক্র দাবি করে—সূরা আল-ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত অনুযায়ী—মুহাম্মদ (সা.) নাকি এক যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন এবং তাঁর পর একটি নতুন বিধানিক ম্যান্ডেটসহ অন্য এক রাসুল নিযুক্ত হয়েছিলেন! তাদের যুক্তি, এই আয়াতে তাঁর নাম ধরে নামপুরুষে (থার্ড পারসন) কথা বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করে অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে কথা বলছেন।
অথচ ৩:১৪৪ আয়াতের মূল আরবি শব্দগুলো বিশ্লেষণ করলে এই বানোয়াট তত্ত্ব সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়:
শর্তবাচক শব্দ ‘যদি’-এর পরম উপস্থিতি: আয়াতে ব্যবহৃত ‘إِن’ (ইন) শব্দটি আরবি ব্যাকরণে একটি নির্দিষ্ট শর্তবাচক কণা (Conditional Particle), যার অর্থ “যদি”। আয়াতের আক্ষরিক অর্থ হলো: *”সুতরাং সে যদি মারা যায় বা নিহত হয়, তবে কি তোমরা তোমাদের গোড়ালির দিকে/পেছনে ফিরে যাবে?”* এটি একটি শর্তযুক্ত বাক্য যা ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনার কথা বলছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় তিনি জীবিত ছিলেন।
নামপুরুষে সম্বোধনের রহস্য: রাসুল (সা.) নিজে কিতাব প্রচার করলেও আল্লাহ কেন তাঁর নাম ধরে নামপুরুষে উল্লেখ করলেন? এটিই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যে কুরআনের বক্তা স্বয়ং আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.) নন। তিনি আল্লাহর দেওয়া বাণী হুবহু মানুষের কাছে পাঠ করে শোনাতেন মাত্র। আল্লাহ যখন মানবতার জন্য কোনো সার্বজনীন আইন ঘোষণা করেন, তখন তিনি রাসুলকে নাম ধরে উল্লেখ করেন, যেমনটি অন্যান্য নবীদের ক্ষেত্রেও করেছিলেন।
সূরা মুহাম্মদের (৪৭:২) চূড়ান্ত প্রমাণ: আল্লাহ কুরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন: *”এবং যারা ঈমান এনেছে… এবং মুহাম্মদ-এর ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস করেছে—আর তা-ই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য…”* যদি ওহী চলাকালীন তিনি মারা যেতেন এবং বিকল্প কিতাবসহ নতুন কোনো রাসুল দায়িত্ব নিতেন, তবে আল্লাহ বলতেন, “বর্তমান রাসুলের ওপর যা অবতীর্ণ হচ্ছে।” কিন্তু কুরআনের পাঠ্য সমস্ত ওহীকে স্থায়ীভাবে এবং একচেটিয়াভাবে মুহাম্মদের (সা.) নামের সাথেই যুক্ত করে।
যৌথ ঘোষণায় নাম বাদ পড়ার অকাট্য প্রমাণ: সূরা বাকারার ১৩৬ নম্বর আয়াতে মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: “তোমরা বলো, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরদের প্রতি এবং যা দেওয়া হয়েছে মুসা ও ঈসাকে এবং যা দেওয়া হয়েছে নবীদেরকে তাদের রবের পক্ষ থেকে। আমরা তাদের কারও মধ্যে কোনো তারতম্য করি না…'”
লক্ষ্যণীয় বিষয়, নবীদের এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক তালিকায় খোদ নির্দেশের মূল পাঠ্য থেকে মুহাম্মদের (সা.) নামটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কারণ, আল্লাহ এখানে সরাসরি রাসুলকে দ্বিতীয় পুরুষে (মধ্যম পুরুষ বা সেকেন্ড পারসন) সম্বোধন করে নির্দেশ দিচ্ছেন মানুষকে কী ঘোষণা করতে হবে। ওহী চলাকালীন তিনি যদি মারা যেতেন এবং কুরআনের বাকি অংশ গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো নবী দায়িত্ব নিতেন, তবে যৌক্তিকভাবেই মুহাম্মদের (সা.) নামটি মুসা ও ঈসার পাশাপাশি অতীতের তালিকায় যুক্ত হতো। তাঁর নামের এই অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে তিনি নিজেই ছিলেন এই নির্দেশের জীবন্ত প্রাপক।
৩. “হে রাসুলগণ!” সম্বোধন এবং সূরা আল-মুমিনুনের প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ
আল্লাহ যখন সূরা আল-মুমিনুনের ৫১ আয়াতে বহুবচন ব্যবহার করে বলেন: يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ (“হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎকাজ করো”), তখন এই একক আয়াতটি বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমরা যদি এর পূর্বাপর প্রসঙ্গ (আয়াত ৪৯-৫৩) লক্ষ্য করি, তবে বিষয়টি কাঁচের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়:
৪৯ আয়াত: “আর আমরা অবশ্যই মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম যাতে তারা হেদায়েত পায়।”
৫০ আয়াত: “আর আমরা ও মারিয়ামের পুত্র (ঈসা) ও তার মাতাকে একটি নিদর্শন বানিয়েছিলাম…”
৫১ আয়াত: “হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎকাজ করো…”
৫২ আয়াত: “আর নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত (সম্প্রদায়) তো একক উম্মত; আর আমিই তোমাদের রব, অতএব আমাকে ভয় করো।”
প্রসঙ্গের মূল সিদ্ধান্ত: এই কালানুক্রমিক ধারাটি প্রমাণ করে, আল্লাহ রাসুলদের ঐতিহাসিক বংশলতিকা (যেমন মুসা, তারপর ঈসা) উল্লেখ করে সকল রাসুলকে একটি একক ‘শ্রেণী’ বা ‘দল’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। এটি মুহাম্মদের (সা.) যুগে একাধিক স্বাধীন বিধানিক রাসুলের সমসাময়িক উপস্থিতি প্রমাণ করে না। বরং ৫২ আয়াত অনুযায়ী, যুগ বা ভাষা ভিন্ন হলেও সমস্ত রাসুলকে দেওয়া মূল ঐশী আইন চিরকাল এক এবং অভিন্ন (أُمَّةً وَاحِدَةً)।
৪. পরিভাষার বিভ্রান্তি দূরীকরণ: ‘রাসুলুল্লাহ’ বনাম ‘রাসুলুম-মিনকুম’
বিরোধীদের ভুল বোঝাবুঝি সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করতে আমাদের কুরআন দ্বারা সংজ্ঞায়িত শব্দগুলোর সুনির্দিষ্ট ভাষাগত পার্থক্য বুঝতে হবে:
রাসুলুল্লাহ (رَسُولُ اللَّهِ) কঠোরভাবে কেবল এমন একজন সুনির্দিষ্ট, ঐশিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিকে বোঝায় যাকে আল্লাহ সরাসরি ওহী গ্রহণের জন্য এবং একটি নতুন বিধানিক বার্তা বা কিতাবসহ নিযুক্ত করেছেন। মুহাম্মদ (সা.) হলেন চূড়ান্ত রাসুলুল্লাহ এবং নবীদের মোহর। |
রাসুলুম-মিনকুম (رَسُولٌ مِّنكُمْ)** এর আক্ষরিক অর্থ “তোমাদের মধ্য থেকে একজন বার্তা-বাহক।” এরা কোনো নতুন কিতাব নিয়ে আসেন না। এরা হলেন সাধারণ নিবেদিতপ্রাণ বিশ্বাসী, যারা ইতিমধ্যে অবতীর্ণ কুরআনকে আয়ত্ত করে তা নিজ নিজ ভাষাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এই ভূমিকা কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে।
রুসুল (رُسُل) এটি কেবলই রাসুল-এর বহুবচন রূপ (রাসুলগণ)। এটি যেমন স্বাধীন নবীদের ঐতিহাসিক সমাবেশকে বোঝাতে পারে, তেমনি সাধারণ বার্তা-বাহকদের সমষ্টিগত দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
৫. কেয়ামতের দিনের জবাবদিহিতা ও প্রতিনিধি প্রেরণের ঐশী ব্যবস্থা
জাহান্নামীদের প্রতি আল্লাহর করা প্রশ্ন: “তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে রাসুলগণ (رَسُولٌ مِّنكُمْ) আসেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের রবের আয়াতসমূহ পাঠ করত?”
(সূরা আজ-জুমার, ৩৯:৭১)—এই আয়াতকে পুঁজি করে দাবি করা হয় যে, প্রতি প্রজন্মে নতুন রাসুল ও নতুন কিতাব আসতে হবে।
অথচ কুরআনের অভ্যন্তরীণ আইন এই বিভ্রান্তি তাৎক্ষণিকভাবে দূর করে দেয়। ভৌত বা বিধান-দাতা নবী ইন্তেকাল করেন, কিন্তু আল্লাহর কিতাব চিরকাল জীবন্ত থাকে। আর কিতাব সংরক্ষিত থাকার অর্থ হলো সাধারণ বার্তা-বাহকদের (رَسُولٌ مِّنكُمْ) মাধ্যমে বার্তার উপস্থিতি সক্রিয় থাকা। নতুন কিতাব ছাড়াই কীভাবে চূড়ান্ত বার্তাটি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তার সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি সূরা আত-তাওবায় শিখিয়েছেন:
> “আর মুমিনদের পক্ষে একসাথে অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। তবে তাদের প্রত্যেকটি বড় দল থেকে একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে (لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ) এবং তাদের সম্প্রদায়ের কাছে যখন ফিরে আসবে তখন তাদের সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা বেঁচে চলতে পারে?” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১২২)
> আয়াতটি বিরোধীদের বিরুদ্ধে একটি পরম কাঠামোগত পাল্টা যুক্তি:
১. আঞ্চলিক ওহীর প্রয়োজন নেই: আল্লাহ বাইরের জাতিগুলোকে তাদের নিজস্ব স্থানীয় নবী বা নতুন কিতাবের জন্য অপেক্ষা করতে বলেননি। পরিবর্তে, মুমিনদের একটি দলকে দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে (لِّيَتَفَقَّهُوا) নিজ নিজ জনগণের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের মাতৃভাষায় সতর্ক করার (وَلِيُنذِرُوا) নির্দেশ দিয়েছেন।
২. আদেশের অধীনে বার্তা-বাহক: এই প্রতিনিধিরাই হলেন প্রকৃত ‘রাসুলুম-মিনকুম’ যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি মাত্র চূড়ান্ত কিতাব বহন করে চলেছেন।
এই কারণেই আল্লাহ বলেন: *”আর তোমরা কীভাবে কুফরি করতে পারো অথচ তোমাদের কাছে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হচ্ছে এবং তোমাদের মধ্যে তাঁর রাসুল রয়েছে (وَفِিকُمْ رَسُولُهُ)?”* (সূরা আল-ইমরান, ৩:১০১)। মুহাম্মদ (সা.) আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে জীবিত না থাকলেও, কিতাবের চূড়ান্ততা এবং এই প্রতিনিধি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁর বার্তার কার্যকারিতা হুবহু বজায় রয়েছে।
‘খাতাম’ শব্দের বিকৃতির খণ্ডন এবং ‘মুসাদ্দিকান’ শব্দের রহস্য
যারা সূরা বাকারার ৭ নম্বর আয়াত (خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ – “আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন”) ব্যবহার করে দাবি করে যে ‘খাতাম’ মানে শেষ বা বন্ধ করা নয়, তারা কুরআনের সামগ্রিক প্রসঙ্গের বিরোধিতা করছে।
কুরআন অনুযায়ী, মানুষ যখন সত্যকে বারবার প্রত্যাখ্যান করে, তখন শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাদের অন্তর সিল বা লক করে দেন (দেখুন ৪:১৫৫, ৬১:৫)। সুতরাং ‘খাতাম’ মানে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
তাছাড়া, কুরআনের পরিভাষা অনুযায়ী পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের “সত্যায়নকারী বা অনুমোদনকারী” বোঝাতে আল্লাহ বিশেষভাবে **‘মুসাদ্দিকান’ (مُصَدِّقًا)** শব্দটি ব্যবহার করেছেন (দেখুন: ৩:৮১, ২:৯১)। অথচ, ৩৩:৪০ আয়াতে আল্লাহ ইচ্ছা করে ‘মুসাদ্দিকান’ শব্দটি এড়িয়ে গিয়ে অনন্য উপাধি **‘খাতামুন-নাবিয়্যিন’ (خَاتَمَ النَّبِيِّينَ)** ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ—তিনি যেমন অতীতের নবীদের সত্যায়নকারী, ঠিক একই সাথে তিনি নবুয়তের প্রবেশদ্বারে চূড়ান্ত সমাপ্তির মোহর এঁটে দিয়েছেন।
মুকাত্তাআত (বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ) সংক্রান্ত দাবি
ভবিষ্যতের নবী আবিষ্কার করার এক মরিয়া চেষ্টায় কেউ কেউ দাবি করে, অনন্য বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ (حُرُوف مُقَطَّعَات) যেমন الم (আলিফ লাম মিম) বা يس (ইয়া সিন)—আসলে গোপন কোনো আঞ্চলিক নবীর নাম।
এই যুক্তিটিও সম্পূর্ণ খণ্ডিত। কারণ, ১২:১ এবং ২:১৮৫ আয়াতে কুরআনকে بَيِّنَاتٌ (স্পষ্ট প্রমাণ) এবং مُبِينٌ (সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের মুক্তির জন্য যদি নতুন কোনো নবীর স্বীকৃতি বাধ্যতামূলক হতো, তবে আল্লাহ এই গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশকে এমন কোনো এনক্রিপ্টেড কোডের মধ্যে লুকিয়ে রাখতেন না।
দীনের পূর্ণতা এবং কিতাবের সার্বজনীনতা
একটি নতুন নবী বা ওহীর প্রয়োজন তখনই হয় যখন পূর্ববর্তী কোনো কিতাব বিকৃত হয়ে যায় বা অপূর্ণ থাকে। কিন্তু আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন:
> “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে নিখুঁত (أَكْمَلْتُ) করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ (أَتْمَمْتُ) করলাম…” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩)
>
যখন একটি জীবনব্যবস্থা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ, তখন নতুন কোনো কিতাবের ঐশী প্রয়োজনীয়তা থাকে না। আল্লাহ এই চূড়ান্ত রাসুলের পরিধিকে সমগ্র মহাবিশ্বের স্কেলে বিস্তৃত করে বলেছেন:
আর আমরা তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির (كَافَّةً لِّلنَّاسِ) জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবেই পাঠিয়েছি।”* (সূরা সাবা, ৩৪:২৮)
“আর আমরা তো তোমাকে সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত (رَحْمَةً لِّعَالَمِينَ) স্বরূপই পাঠিয়েছি।”* (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭)
ভাষার বৈচিত্র্য আল্লাহর নিদর্শন এবং ওহীর যৌক্তিকতা:
“আরবি আমাদের ভাষা নয়, সুতরাং কুরআন আমাদের জন্য নয়”—এই যুক্তিটি সরাসরি আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্যকে অস্বীকার করে। সূরা আর-রুমের ২২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, মানুষের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য আল্লাহর অন্যতম বড় নিদর্শন।
তৎকালীন আরব শ্রোতারা অত্যন্ত কঠোর এবং অজুহাত তৈরিতে পারদর্শী ছিল (৯:৯৭)। আল্লাহ যদি কুরআন কোনো বিদেশী ভাষায় অবতীর্ণ করতেন, তবে আরবরা ভাষাগত অজুহাত দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করত। কুরআন নিজেই এই মানসিকতার জবাব দিয়েছে:
> “আর আমরা যদি একে অনারবি কুরআন বানাতাম, তবে তারা অবশ্যই বলত, ‘এর আয়াতগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি কেন? ভাষা অনারবি আর রাসুল আরবি?'” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৪৪)
>
অতএব, এটি তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল প্রাথমিকভাবে প্রথম শ্রোতাদের অজুহাত দূর করার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল যেন সেখান থেকে স্থানীয় ভাষাভাষী বার্তা-বাহকদের (رَسُولٌ мِّنكُم) দ্বারা এটি বিশ্বজুড়ে অনুবাদ ও প্রচারিত হয়। আর এই উপদেশ গ্রহণকে সহজ করতে আল্লাহ সূরা আল-কামারের একই প্রতিশ্রুতি চারবার পুনরাবৃত্তি করেছেন।
উপসংহার:
কুরআনের আয়াতগুলোকে প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং “নতুন কিতাব নিয়ে নতুন নবী আসার” বানোয়াট তত্ত্ব উদ্ভাবনের জন্য ব্যাকরণগত কাঠামোকে বিকৃত করা কিতাবের পবিত্রতা লঙ্ঘন করে। সাধারণ বার্তা-বাহকদের (رَسُولٌ মِّنكُم) ধারাবাহিকতা একটি বাস্তব সত্য, কিন্তু নতুন ‘রাসুলুল্লাহ’ চরিত্রের কোনো কাল্পনিক ধারা কুরআনে নেই। মুহাম্মদ (সা.) হলেন চূড়ান্ত নবী (خَاتَمَ النَّبِيِّينَ) এবং কুরআন হলো সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর চূড়ান্ত, সম্পূর্ণ ও সার্বজনীন গাইডবুক।