ইসলামি ব্যাংকের পল্লিউন্নয়ন প্রকল্প: ৩৩ হাজার গ্রামের ১৮ লাখ প্রান্তিক মানুষ এখন উদ্যোক্তা
দারিদ্র্য ঘুচিয়ে স্বনির্ভরতার পথে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লক্ষাধিক নারী-পুরুষ; গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে ক্ষুদ্রঋণ ও প্রশিক্ষণভিত্তিক এই প্রকল্প।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষ আজ স্বাবলম্বী। তাদের হাতে এখন কাজের সুযোগ, আয়ের পথ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস। এই রূপান্তরের গল্প লিখেছে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পল্লিউন্নয়ন প্রকল্প।
প্রকল্পটির সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ পর্যন্ত দেশের ৩৩ হাজার গ্রামের ১৮ লাখের বেশি প্রান্তিক নারী-পুরুষকে উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে এই ব্যাংক। গ্রামের মেঝে থেকে উঠে আসা এসব মানুষ এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা?
১৯৯৫ সালে ‘গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে ইসলামি ব্যাংকের পল্লিউন্নয়ন প্রকল্প। শুরুতে খুব ছোট পরিসরে কাজ শুরু হলেও কালক্রমে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ সমাজভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচিতে পরিণত হয়।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, এ প্রকল্পের আওতায় ঋণগ্রহীতাদের শুধু টাকা ধার দেওয়া হয় না; বরং তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, বিপণনে সহায়তা এবং নানামুখী পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি, ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুদমুক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়।
কার্যক্রমের গভীরতা ও বৈশিষ্ট্য
এক নজরে প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থান:
· মোট গ্রামের সংখ্যা: ৩৩,০০০ (সারাদেশের প্রায় ৫০% গ্রামে পৌঁছেছে)
· সক্রিয় উদ্যোক্তা: ১৮ লাখের বেশি (৯০% নারী)
· ক্ষুদ্র উদ্যোগের ধরন: গবাদিপশু লালন-পালন, হাঁস-মুরগি খামার, সবজি চাষ, হস্তশিল্প, মুদি দোকান, গার্মেন্টস সহায়ক শিল্প প্রভৃতি।
· ঋণ পরিশোধের হার: ৯৮% এর বেশি (যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ)
এসব উদ্যোক্তার প্রতিদিনের আয় এখন গড়ে ২০০-৫০০ টাকা। যা আগে ছিল দিনে ৫০-১০০ টাকারও কম। ফলে তাঁদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে উঠেছে, বাড়ি মেরামত থেকে শুরু করে সন্তানের লেখাপড়া সবকিছুতেই অর্থের জোগান দিতে পারছেন তাঁরা।
সাফল্যের গল্প: “আমি আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি”
রাজশাহীর চারঘাটের রাবেয়া খাতুন চার বছর আগে স্বামীর সংসারে অভাবের সংকটে দিনাতিপাত করতেন। পল্লিউন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তিনি ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন মুরগির খামার। এখন তাঁর বাৎসরিক আয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। তিনি বলেন,
“আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করতাম। এখন নিজের কাজ করি, পাশের বাড়ির কয়েকজন নারীকেও কাজ দিয়েছি। ব্যাংকের দিদিরা মাসে একবার এসে নতুন কোনো আইডিয়া শিখিয়ে যান।”
এমন সাফল্যের গল্প এখন লাখো পরিবারের।
কেন এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ এখনও বিভিন্ন মাত্রার দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। যার অধিকাংশই প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করেন। বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকের আওতার বাইরে থেকে যাওয়া এসব মানুষকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে পল্লিউন্নয়ন ভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ মডেল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
ইসলামি ব্যাংকের এই প্রকল্প শুধু ঋণদাতা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যবসা যেখানে দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে ব্যাংক লাভের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেয় মানুষের মানবিক উন্নয়নে।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
এত সাফল্য সত্ত্বেও সংকটের শেষ নেই। প্রকল্পের পরিচালকরা জানান, চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে ন্যাচারাল ডিজাস্টার (বন্যা, খরা), কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতা। এসব মোকাবিলায় আরও উন্নত প্রশিক্ষণ ও কৃষি প্রযুক্তি হাতে পৌঁছে দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আশাবাদী। তাদের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী পাঁচ বছরে আরও ২০ হাজার গ্রামে এই প্রকল্প সম্প্রসারণ করা হবে। লক্ষ্যমাত্রা ৩০ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করা।
পত্রিকার পাঠকের জন্য তথ্যসূত্র
ইসলামি ব্যাংকের পল্লিউন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির এক অনন্য মডেল। স্বল্প পুঁজিতে কিভাবে বড় রূপান্তর সম্ভব তার বাস্তব উদাহরণ এটি। সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো এই মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে।
যেকোনো পাঠক চাইলে স্থানীয় ইসলামি ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন। কারণ দারিদ্র্য একা কমে না, একসঙ্গে এগোলে তবেই সম্ভব। আর সেই যাত্রার সেতু হয়ে আছে ইসলামি ব্যাংকের পল্লিউন্নয়ন প্রকল্প।