ঐতিহ্যের অন্ধ অনুসরণ বনাম কুরআনের নির্দেশনা
সংখ্যাগরিষ্ঠতা, প্রথা ও মতবাদের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে কি কুরআনের মূল বার্তা? এক গভীর সংকটের মুখোমুখি মুসলিম সমাজ।
বর্তমান মুসলিম সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঐতিহ্য ও প্রচলিত প্রথার প্রতি অন্ধ আনুগত্য, যা অনেক ক্ষেত্রে কুরআনের সরাসরি নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রীতি-নীতি ও সামাজিক বিশ্বাসকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে, এমনকি যখন তা কুরআনের স্পষ্ট বাণীর বিপরীতে অবস্থান করে।
প্রশ্ন উঠে “হাজার বছর ধরে চলে আসা বিশ্বাস কি ভুল হতে পারে?” এই প্রশ্নকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অনেকেই কুরআনের নির্দেশনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। অথচ কুরআন নিজেই এমন মানসিকতাকে সতর্কভাবে চিহ্নিত করেছে।
অন্ধ অনুসরণ বনাম সত্যের অনুসন্ধান
কুরআনে বলা হয়েছে
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۗ أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ করো’, তারা বলে, ‘বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যেভাবে পেয়েছি, আমরা তারই অনুসরণ করব।’ যদিও তাদের পিতৃপুরুষরা কিছুই বুঝত না এবং তারা সৎপথেও ছিল না।” সূরা আল-বাকারা (২:১৭০)
অন্যদিকে—
وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ
“আর যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। তারা তো কেবল অনুমানের অনুসরণ করে, আর তারা শুধু আন্দাজই করে।” সূরা আল-আন‘আম (৬:১১৬)
দোদুল্যমান বিশ্বাস: ‘মুজাবজাবীন’ মানসিকতা
কুরআনে এমন একটি শ্রেণির কথা বলা হয়েছে, যারা বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। সূরা আন-নিসা (৪:১৪৩) তাদের “مُذَبْذَبِينَ” বা দোদুল্যমান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
“তারা দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে—না এদের দিকে, না ওদের দিকে। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি তার জন্য কোনো পথ পাবে না।” — সূরা আন-নিসা (৪:১৪৩)ঋ
এরা পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশ্বাস পরিবর্তন করে। সূরা আল-হজ্জ (২২:১১)
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَىٰ حَرْفٍ ۖ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ ۖ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَىٰ وَجْهِهِ ۚ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে দ্বিধার ওপর দাঁড়িয়ে। যদি তার কাছে কোনো কল্যাণ পৌঁছে, তবে সে তাতে সন্তুষ্ট হয়; আর যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তবে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারিয়েছে। এটাই স্পষ্ট ক্ষতি।” সূরা আল-হজ্জ (২২:১১)
কর্তৃত্বের প্রশ্ন: আল্লাহর বিধান নাকি মানব-নির্মিত ধারণা?
কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا ۚ وَالَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْلَمُونَ أَنَّهُ مُنَزَّلٌ مِن رَّبِّكَ بِالْحَقِّ ۖ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ
“তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ফয়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ করব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি এই বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তারা জানে এটি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ নাযিল হয়েছে। অতএব তুমি কখনো সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” সূরা আল-আন‘আম (৬:১১৪)
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেকেই ধর্মীয় বিধান নির্ধারণে মানুষের মতামত বা প্রথাকে প্রাধান্য দেয়।
“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশ অস্বীকার করো?” সূরা আল-বাকারা (২:৮৫)
“তারা তাদের আলেম ও সন্ন্যাসীদেরকে আল্লাহ ছাড়া প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে…” সূরা আত-তাওবা (৯:৩১)
প্রমাণ ছাড়া ধর্মীয় অনুশীলন: কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
কুরআনের দৃষ্টিতে কোনো ইবাদত বা ধর্মীয় বিধান গ্রহণযোগ্য হতে হলে তার পক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল থাকতে হবে।
“বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই…” সূরা ইউসুফ (১২:৪০)
“তারা এমন কিছুর ইবাদত করে, যার জন্য আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি…” সূরা আল-হজ্জ (২২:৭১)
“তারা তো কেবল ধারণা ও নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে…” সূরা আন-নাজম (৫৩:২৩)
কুরআনের পরিপূর্ণতা: আর কোনো উৎসের প্রয়োজন আছে কি?
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ধর্মীয় নির্দেশনার জন্য কুরআন কি যথেষ্ট?
“তাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি…” সূরা আল-আনকাবুত (২৯:৫১)
“তারা তোমার কাছে কোনো দৃষ্টান্ত উপস্থিত করে না, কিন্তু আমি তোমার কাছে সত্য ও উত্তম ব্যাখ্যা উপস্থিত করি।” সূরা আল-ফুরকান (২৫:৩৩)
রাসূলের দায়িত্ব: ওহীর সীমারেখা
কুরআন অনুযায়ী রাসূল কেবল সেই ওহীই অনুসরণ করতেন যা তার প্রতি নাযিল করা হয়েছে।
“বলুন, আমি নিজ থেকে তা পরিবর্তন করতে পারি না; আমি তো কেবল সেই ওহীর অনুসরণ করি যা আমার প্রতি প্রেরিত হয়…” সূরা ইউনুস (১০:১৫)
“এটি এক সম্মানিত রাসূলের বাণী… যদি সে আমার নামে কিছু রচনা করত… তবে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম এবং তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম…” সূরা আল-হাক্কাহ (৬৯:৪০–৪৬)
বিভক্তি: এক উম্মাহ থেকে বহু দলে
মুসলিমদের একত্রিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না…” সূরা আলে ইমরান (৩:১০৩)
“তারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে…” সূরা আর-রূম (৩০:৩২)
“যারা নিজেদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই…” সূরা আল-আনআম (৬:১৫৯)
আল্লাহকে দ্বীন শেখানোর প্রবণতা
“তোমরা কি আল্লাহকে তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে জানাতে চাও?” সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:১৬)
“তাদের মধ্যে একদল আছে যারা কিতাবকে বিকৃতভাবে পড়ে, যাতে তোমরা মনে করো এটি কিতাবের অংশ…” সূরা আলে ইমরান (৩:৭৮)
ফিরে আসার আহ্বান
বর্তমান বাস্তবতায় স্পষ্ট যে, প্রথা ও ঐতিহ্যের মোহ অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে কুরআনের মূল বার্তা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কুরআনের প্রতি প্রত্যাবর্তন এবং গভীর চিন্তা-গবেষণা।
“তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা লেগে আছে?” সূরা মুহাম্মদ (৪৭:২৪)
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই নিহিত রয়েছে আত্মসমালোচনা, সংশোধন এবং সঠিক পথের সন্ধান।