অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে একটি সময়োপযোগী প্রস্তাব
বাংলাদেশী প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বর্তমানে দেশ যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে দ্রুত মুক্তির একটি অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে সরকারি উদ্যোগে নামমাত্র বা স্বল্প মূল্যে বিপুল পরিমাণ জনশক্তিকে বিদেশে পাঠানো।
বর্তমানে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ কর্মী জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে এই খাতের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়। বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে একজন সাধারণ কর্মীকে বিদেশে যেতে ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়।
এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কর্মীরা জমি বিক্রি করেন বা চড়া সুদে ঋণ নেন। ফলে বিদেশে গিয়ে প্রথম ২-৩ বছর তাদের কেবল ঋণের টাকাই পরিশোধ করতে হয়, যা দেশের মূল অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনা। উপরন্তু, অনেকে অবৈধ পথে টাকা পাঠানোর (হুন্ডি) দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা দেশের রিজার্ভে যোগ হয় না।
সরকারি উদ্যোগে ‘স্বল্প মূল্যের’ অভিবাসন মডেলঃ
যদি সরকার সরাসরি বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (G2G) করে এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে নামমাত্র খরচে কর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা করে, তবে এর সুফল হবে সুদূরপ্রসারী।
[কর্মী নির্বাচন] ➔ [সরকারি খরচে/ঋণে প্রশিক্ষণ] ➔ [G2G চুক্তিতে স্বল্প ব্যয়ে বিদেশ গমন] ➔ [প্রথম মাস থেকেই বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স প্রেরণ]
এই মডেলের মূল ধাপসমূহঃ
ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেল শক্তিশালীকরণ: মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ (যেমন- ইতালি, রোমানিয়া), এবং পূর্ব এশিয়ার (যেমন- জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) দেশগুলোর সাথে সরাসরি চুক্তি করা।
ওয়ান-স্টপ সার্ভিস: পাসপোর্ট, মেডিকেল, ভিসা এবং টিকিট—সবকিছু একটি সরকারি আমব্রেলা বা নিয়ন্ত্রণের অধীনে নিয়ে আসা যাতে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়।
অভিবাসন ঋণ: সরকার যদি নামমাত্র খরচে (যেমন: ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকার মধ্যে) কর্মী পাঠায় এবং সেই টাকাও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে দেয়, তবে কর্মীর নিজের পকেট থেকে কোনো টাকা লাগবে না।
রেমিট্যান্সের গতিঃ প্রথম ২-৩ বছর কর্মীরা ঋণের টাকা শোধ করতেই ব্যস্ত থাকে। | বিদেশ যাওয়ার প্রথম মাস থেকেই কর্মীরা পরিবারকে সরাসরি টাকা পাঠাতে পারবেন।
বৈধ চ্যানেলে আয়ঃ দালালের মাধ্যমে যাওয়ায় অনেকেই হুন্ডির আশ্রয় নেন। | সরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে অ্যাকাউন্ট খুলে রেমিট্যান্স আসবে।
রিজার্ভের ওপর প্রভাবঃ ধীরগতির প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ মাসের মধ্যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
দ্রুত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূত্র:
১ লক্ষ কর্মী ✖ গড়ে ৫০০ ডলার/মাস = প্রতি মাসে ৫ কোটি ডলার (বৈধ রিজার্ভ বৃদ্ধি)
বাস্তবায়নের জন্য কিছু জরুরি সুপারিশ:
কর্মপরিকল্পনা:
1. দক্ষতা উন্নয়ন ও সার্টিফাইড ট্রেনিং
সময়: ১-৩ মাস শুধু অদক্ষ শ্রমিক না পাঠিয়ে, দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে (TTC) আধুনিকায়ন করে ড্রাইভিং, নার্সিং, আইটি, ওয়েল্ডিং এবং ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। দক্ষ কর্মীর বেতন অদক্ষ কর্মীর চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি হয়।
2. ডিজিটাল ডেটাবেজ ও স্বচ্ছ নিয়োগ
সময়: চলমান ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ বা অনুরূপ সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা। লটারির মাধ্যমে কর্মী নির্বাচন করলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ হবে।
3. রেমিট্যান্সে বিশেষ প্রণোদনা
সময়: তাৎক্ষণিক
বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠালে সরকারি প্রণোদনা (বর্তমানে যা ২.৫%) আরও কিছুটা বৃদ্ধি করা বা প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সঞ্চয়পত্র ও বিমা সুবিধা চালু করা।
জনশক্তিকে সস্তা বা স্বল্প মূল্যে বিদেশে পাঠানোকে “ব্যয়” হিসেবে না দেখে সরকারের একটি উচ্চ লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। সরকার যদি একজন কর্মীর পেছনে প্রাথমিক খরচ ভর্তুকি বা ঋণ হিসেবেও দেয়, সেই কর্মী মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরত পাঠাবেন। এই উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের বর্তমান ডলার সংকট ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা খুব দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।